দারাজে বিজ্ঞাপন দিয়ে মাদক বিক্রি, অভিযানে বাড্ডা থেকে কেমিস্ট গ্রেপ্তার
ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম দারাজের অনলাইন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাদক বিক্রি করে আসছিলেন তিনি। বিষয়টি জানার পর ক্রেতা সেজে সেই মাদক সংগ্রহ করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তা পাঠানো হয় রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষায় তরল পদার্থটিতে ‘টিএইচসি’ (টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল-গাজার উপাদান) নামের উচ্চ মাত্রার মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। নিশ্চিত হয়ে ফাঁদ পাতেন কর্মকর্তারা। আরও তিন বোতল মাদক ফরমাশ দেওয়া হয়। সেই পার্সেল পৌঁছে দিতে এসে হাতেনাতে ধরা পড়েন দারাজের এক পণ্য সরবরাহকারী কর্মী (ডেলিভারিম্যান)। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বাড্ডার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মাদকসহ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান (৪০) নামের ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, আনিসুর দারাজের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এই মাদক বিক্রি করে আসছিলেন। টিএইচসি মূলত গাঁজার ঘনীভূত তরল নির্যাস। যন্ত্রের সাহায্যে গাঁজা প্রক্রিয়াজাত করে তেলের মতো তৈরি করা হয়। এটি সরাসরি জিবে দিয়ে অথবা ভেপের (ই-সিগারেট) ভেতরে কয়েক ফোঁটা মিশিয়ে নেশা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গ্রেপ্তার আনিসুর এটিকে ‘সিবিডি তেল’ নামে অনলাইনে বিক্রি করতেন। গত পাঁচ বছরে তিনি প্রায় ৪০৫ বোতল টিএইচসি বিক্রি করেছেন।
গত রোববার রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকার একটি চারতলা বাড়িতে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সেখান থেকে ৬২০ মিলিলিটার টিএইচসি মাদক উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ওই বাসা থেকে মাদক প্রস্তুত ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন সরঞ্জাম, ৫০টি ছোট কাচের বোতল, দারাজের লোগোযুক্ত পলিথিন প্যাকেট, কম্পিউটার ও মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সোমবার বাড্ডা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আনিসুর রহমান ছাড়াও দারাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) আসামি করা হয়।
এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দারাজ যাচাই–বাছাই না করে এ মাদক বিক্রি করে আসছিল। অনলাইন ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা আইনগত অপরাধ।’ তিনি বলেন, ‘অনলাইনে মাদক কেনাবেচা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি করা হয়।’
দীর্ঘদিন ধরে দারাজ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানতে পারে, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দারাজ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ মাদক টিএইচসি কেনাবেচা হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে এই অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে প্রায় ৪০৫ বোতল মাদক বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়।
রাসায়নিক পরীক্ষায় মাদকের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ডিএনসির কর্মকর্তারা ক্রেতা সেজে তিনটি কাচের বোতলে প্রতিটিতে ২০ মিলিলিটার করে মোট ৬০ মিলিলিটার টিএইচসির ফরমাশ দেন। সেই পার্সেল নিয়ে ১৬ আগস্ট বিকেল চারটা পাঁচ মিনিটে রমনার সেগুনবাগিচা তোপখানা রোডের নকশী টাওয়ারের সামনে আসেন দারাজের পণ্য সরবরাহকারী কর্মী মো. নাঈম (২০)।
এজাহারে বলা হয়, নাঈমকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে তাঁর সঙ্গে থাকা খাকি রঙের পার্সেলটি তল্লাশি করা হলে ভেতরে পলিথিনে মোড়ানো তিনটি কাচের বোতলে মোট ৬০ মিলিলিটার টিএইচসি পাওয়া যায়। বিকেল সাড়ে চারটায় এসব আলামত জব্দ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে নাঈম জানান, পার্সেলটি তিনি বাড্ডার পূর্ব পদরদিয়া আলীনগর সাঁতারকুলের একটি চারতলা ভবনের চতুর্থ তলা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। পার্সেলের ভেতরে যে মাদক ছিল, তা তিনি জানতেন না। কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি কেবল পার্সেলটি পৌঁছে দিতে এসেছিলেন। এই মাদক কারবারের সঙ্গে নাঈমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় তাঁকে আটক করা হয়নি।
নাঈমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দলটি বাড্ডার পূর্ব পদরদিয়া আলীনগর সাঁতারকুলের ওই ভবনে যায়। সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়। পরে বাড়ির মালিক মোহাম্মদ খোকন মিয়াসহ আরেকজনকে সাক্ষী রেখে চতুর্থ তলার উত্তর পাশের একটি ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন কর্মকর্তারা।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সন্ধ্যা সাতটা পাঁচ মিনিটে কক্ষের ভেতর চেয়ারে বসা অবস্থায় আনিসুর রহমানকে আটক করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার দুপুর থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত রমনা, বাড্ডা ও রামপুরার তিনটি স্থানে অভিযান চালানো হয়।
রোববার রাত ১০টার দিকে অভিযানকারী দল রামপুরায় দারাজের হাব কার্যালয়ে যায়। সেখানে হাব সুপারভাইজার মো. সৈয়দ ইরফানকে (৩১) জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি দারাজের প্ল্যাটফর্মে টিএইচসির বিজ্ঞাপন থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, বিজ্ঞাপনের বিষয়গুলো দারাজের বনানী প্রধান কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেখাশোনা করেন। পরে হাব সুপারভাইজার সৈয়দ ইরফান ও জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেনের (৫৩) উপস্থিতিতে পার্সেলসংক্রান্ত তথ্যের দুই পাতার নথিপত্র জব্দ করা হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দারাজের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ রাইসুল ইসলাম বাপ্পীর মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি। পরে দারাজের আইন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
সাবান তৈরির আড়ালে মাদক ব্যবসা
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আনিসুর রহমান পেশায় একজন কেমিস্ট (রসায়নবিদ)। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি জাপানে যান। সেখান থেকে দেশে ফিরে তিনি হাতে তৈরি সাবান বানিয়ে বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। পরে তিনি সাবান ব্যবসার আড়ালে মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। আনিসুর দারাজসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে এই মাদক বিক্রি করে আসছিলেন।
আনিসুরকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, ভারত থেকে অবৈধ পথে এসব মাদক দেশে আনা হতো। পরে তা ‘সিবিডি তেল’ নামে ছোট বোতলে ভরে অনলাইনে বিক্রি করা হতো।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আনিসুর নিজেও মাদকাসক্ত। গ্রেপ্তারের পর তাঁর ডোপ টেস্ট করা হয়েছে। অ্যারোমেটিক অয়েল নামে মাদকটি অনলাইনে বিক্রি করা হতো।’