দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যার সময় বাসায় খাচ্ছিলেন এমপি গাজী নজরুল

আদালতে শুনানি শেষে হাজতখানায় নেওয়া হচ্ছে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে। গতকাল সোমবার বিকেলে ঢাকার সিএমএম আদালত প্রাঙ্গণেছবি: প্রথম আলো

দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুন ‘আত্মহত্যার’ সময় ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটেই ছিলেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। তখন তিনি এলাকার নেতা–কর্মীদের সঙ্গে খাচ্ছিলেন। খাওয়া শেষে মরিয়ম খেয়েছে কি না, খোঁজ নিতে গিয়ে মরিয়মের থাকার কক্ষটি ভেতর থেকে বন্ধ পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

মরিয়মের বাবার করা আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় গ্রেপ্তার গাজী নজরুল ইসলাম রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। গত রোববার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের উল্টো দিকে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের (১৯) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ফ্ল্যাটটি গাজী নজরুল ইসলামের। তিনি সেখানে তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে থাকতেন। মরিয়মের লাশ উদ্ধারের পর গাজী নজরুল বলেছিলেন, ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের একটি সূত্র বলছে, গাজী নজরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন। তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল আদালত মাকছুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।

মামলাটি এখন তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগ। তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ আজ মঙ্গলবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁরা কিছু তথ্য দিয়েছেন। সেগুলো যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানা থেকে বের করা হচ্ছে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: ইউএনবি

গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত জুলাইয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়। পরে গাজী নজরুল ইসলাম জানান, ওই তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন। এ ঘটনার পর ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে।

এর পর থেকে গাজী নজরুল তাঁর দুই স্ত্রীকে নিয়ে ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন। সেখানে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা মরিয়ম বিভিন্ন সময় পরিবারকে জানিয়েছিলেন বলে এ ঘটনায় হওয়া মামলায় উল্লেখ করেছেন তাঁর বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ। রোববার সন্ধ্যায় মরিয়মের লাশ উদ্ধার হওয়ার পর শেরেবাংলা নগর থানায় তাঁকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন তিনি।

এ মামলায় ওই রাতেই গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন সোমবার গাজী নজরুলকে চার দিনের এবং মাকছুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। গতকালই মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব ডিবি পুলিশকে দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে এক জায়গায় করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ডিবি পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের কর্মকর্তারা। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে এ ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে আজ আদালতে উত্থাপিত আবেদন উল্লেখ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন

ওই জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে অবগত এক পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, মাকছুদা বলেছেন, ওই দিন ঘটনাটির আগে মরিয়মের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়নি। কেন মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন, তা তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না।

আর গাজী নজরুল ইসলাম ঘটনার সময় বাসায় থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সকালে বাসা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন কাজ সেরে বেলা দুইটার দিকে বাসায় ফেরেন। দুপুরে বাসায় এলাকার কিছু নেতা–কর্মী এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার পর একসঙ্গে বসে দুপুরের খাবার খান। খাওয়া শেষে মরিয়ম খেয়েছেন কি না, সে খোঁজ নিতে তাঁর কক্ষের সামনে গিয়ে দেখেন, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। পরে ডাকাডাকি করে কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে দরজা ভাঙার পর ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান।

আরও পড়ুন

তদন্তসংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল বলে দাবি করেছেন গাজী নজরুল। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছেন, তাঁদের যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটা নিয়ে মরিয়ম মানসিক অশান্তিতে ছিলেন। এখনো মানুষ সেটা দেখে, এমনটা মনে করে নানা সময়ে তাঁর কাছে বিষয়টি তুলতেন।

এ মামলায় গাজী নজরুল ও তাঁর স্ত্রী মাকছুদা ছাড়াও নিহত মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, ওবায়দুর রহমানকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।