‘ফাঁকা’ দোকান দেখিয়ে আদায় করা হচ্ছে ভাড়া, নিয়ন্ত্রণে বিএনপির নেতা–কর্মীরা

রাজধানীর মিরপুরের হজরত শাহ আলী মাজার শরিফ কাঁচাবাজার আড়ত কমপ্লেক্সের এসব দোকান কাগজে ফাঁকা দেখানো হলেও এগুলোতে নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে। এগুলো থেকে ভাড়াও আদায় করা হচ্ছেছবি: প্রথম আলো

কোনো দোকানের বরাদ্দ বাতিল। কোনোটির কখনো বরাদ্দই হয়নি। অথচ এসব দোকানেও চলছে ব্যবসা। একেকটি দোকান থেকে মাসে আদায় করা হচ্ছে ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। শুধু তা–ই নয়, দোকানের বাইরে পণ্য রাখার জায়গা থেকেও নেওয়া হচ্ছে ‘ফুট ভাড়া’।

রাজধানীর মিরপুরের হজরত শাহ আলী মাজার শরিফ কাঁচাবাজার আড়ত কমপ্লেক্সের ৪৪টি দোকান থেকে এভাবে যোগসাজশে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নথিতে এসব দোকান ‘ফাঁকা’ দেখানো আছে, মানে এগুলোর ভাড়া হয়নি।

আড়তের ব্যবসায়ী ও মাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, এসব দোকান থেকে প্রতিদিন লাখ টাকার বেশি আদায় করা হচ্ছে। বছরে প্রায় চার কোটি টাকা।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এসব দোকান ‘গোপনে’ ভাড়া দেওয়া ও ভাড়া আদায়ের সঙ্গে মাজারের লোকজনসহ বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মীর জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মাজার সূত্র জানায়, গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আড়তের নিয়ন্ত্রণে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব বেড়েছে। আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা–কর্মীরা। অবশ্য রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে আগের বরাদ্দধারীদের কেউ কেউ তাঁদের দোকানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন।

কাগজে ফাঁকা, বাস্তবে চালু

হজরত শাহ আলী মাজার শরিফ কাঁচাবাজার আড়ত কমপ্লেক্সের অবস্থান শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের কাছে। এ আড়ত কমপ্লেক্সে মোট দোকান আছে ৫১৬টি। মাজার ও ব্যবসায়ী সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৫০৮টি বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকি আটটির মধ্যে তিনটির পজেশন (জায়গা) থাকলেও ঘর নির্মিত হয়নি। অন্য পাঁচটি কখনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কাগজে ফাঁকা থাকা ৪৪টি দোকানের মধ্যে এই পাঁচটি রয়েছে। বাকি ৩৯টির মধ্যে ৩৬টির বরাদ্দ বিভিন্ন কারণে বাতিল হয়েছে। তা ছাড়া এ তালিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা ও ঢাকা উত্তর সিটির (ডিএনসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মুজিব সরোয়ারের (মাসুম) দুটি এবং সাভারের কাউন্দিয়ার সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান খানের একটি দোকান।

১ ও ৩ অক্টোবর সরেজমিন দেখা যায়, ফাঁকা হিসেবে দেখানো দোকানগুলোর জায়গায় ব্যবসা চলছে। কোথাও একটি দোকান ভাগ করে একাধিক ব্যবসায়ী বসেছেন। একই নম্বরে একাধিক দোকান, আবার অনেক দোকানে নম্বরই নেই। কয়েকজন ব্যবসায়ী নিজের দোকানের নম্বরও জানেন না।

এ রকম ৫১৬টি দোকান আছে রাজধানীর মিরপুরের হজরত শাহ আলী মাজার শরিফ কাঁচাবাজার আড়ত কমপ্লেক্সে
ছবি: প্রথম আলো

ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাবে, এসব দোকান থেকে গড়ে দৈনিক দুই হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। সঙ্গে ‘ফুট ভাড়া’ যোগ করে দৈনিক আদায় লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ফুট ভাড়া হলো দোকানের সামনের ফাঁকা জায়গায় কাউকে ব্যবসা করতে দিয়ে তাঁর কাছ থেকে টাকা নেওয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দোকান বরাদ্দ পেতে এককালীন ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা জামানত এবং মাসে দোকানের আকার অনুযায়ী তিন থেকে সাত হাজার টাকা ‘মাটি ভাড়া’ নেয় মাজার কর্তৃপক্ষ। অথচ বরাদ্দধারীদের অনেকে নিজেরা ব্যবসা না করে দোকান অন্যকে মাসে ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় ভাড়া দেন। মানে হলো, মাজার কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে অনেক টাকা হারাচ্ছে।

কার হাতে দোকান, কার কাছে ভাড়া

৩৯৮ নম্বর দোকানের আড়তদার মো. পান্না প্রথম আলোকে বলেন, তিনি দোকানের মালিক নন; মাজারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী ইয়াসিন আরাফাতের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করেন এবং তাঁকেই টাকা দেন। আরও দুই আড়তদার একই অভিযোগ করেছেন। তবে তাঁরা পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি।

তবে ইয়াসিন আরাফাত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কিছু দোকান আগের মালিকদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা ভাড়া নিয়েছেন। তিনি জড়িত নন।

৩১২/১ নম্বর দোকানের বরাদ্দধারী মো. বদিউজ্জামানের কাছে মাজারের পাওনা ৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা। বকেয়ার কারণে বরাদ্দ বাতিল হয়েছে। পাশের ৩১২/২ নম্বর দোকানটি কখনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এ দুটি দোকানে কলার ব্যবসা করছেন হাফিজুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মো. দেলোয়ার নামের একজনকে দোকানপ্রতি ৩০ হাজার করে মোট ৬০ হাজার টাকা ভাড়া দেন।

সাবেক কাউন্সিলর মুজিব সরোয়ারের ১৯৮ নম্বর দোকানটি পাঁচ ভাগ করে ব্যবসা চলছে। প্রতিটির আড়তদার আলাদা। তাঁদের মধ্যে একজন ইমন জানান, তাঁরা প্রতিদিন ৮০০ টাকা করে ভাড়া দেন। ১৯৮ ও ২০০ নম্বর দোকান দারুস সালাম থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শ্যামল আহমেদ রাসেলের নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে শ্যামল প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, আড়তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নেই। কাউন্সিলর নির্বাচন করতে চান বলে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।

১৯ নম্বর দোকানের আড়তদার আলফাজ উদ্দিন জানান, তাঁর দোকানের মাসিক ভাড়া এক লাখ টাকা। একাধিক ব্যবসায়ীর দাবি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বহিষ্কৃত সদস্য হাফিজুল হাসান ওরফে কানা শুভ্র এই দোকানের ভাড়া তোলেন। তবে ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে হাফিজুল বলেন, আড়তে তাঁর কোনো দোকান নেই।

আবার ৪৫২, ৪৫৩ ও ৪৫৪ নম্বর দোকানের আগের মালিক মো. সোহান এখনো দোকানগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তাঁর দাবি, তিনি বরাদ্দ বাতিলের নথি পাননি, এখন দোকানের ভাড়াও পান না। অথচ এসব দোকান ভাড়া নেওয়া ফিরোজ আলম তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি নিয়মিত ভাড়া দিচ্ছেন।