২০ হাজার বৈধ অস্ত্র জমা পড়েনি

জমা না পড়ায় বৈধ অস্ত্রগুলো এখন অবৈধ গণ্য করা হচ্ছে। মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা; গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সব বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র জমা পড়েনি। জমা না পড়া অস্ত্রের সংখ্যা ২০ হাজার ২৮৮, শতাংশের হিসাবে ৪২। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করার অংশ হিসেবে লাইসেন্সকৃত এসব জমা দিতে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, থানায় জমা না হওয়া এসব অস্ত্র এখন অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এসব অস্ত্রের মালিকদের তালিকা করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভোটের মাঠে এসব আগ্নেয়াস্ত্র যাতে সহিংসতায় ব্যবহার না হয়, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি অস্ত্রের মালিকদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, সারা দেশে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৩ হাজার ৭০২টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তির নামে ৪৮ হাজার ২৮৩টি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে ৪ হাজার ৮৫৪টি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৬৫টি। এর মধ্যে শুধু ব্যক্তির নামে লাইসেন্স করা অস্ত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল।

তবে সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে (৩১ জানুয়ারি) দেশের বিভিন্ন থানায় ২৭ হাজার ৯৯৫টি বৈধ বা লাইসেন্স করা অস্ত্র জমা পড়ে। ২০ হাজার ২৮৮টি অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি। আদেশ লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন ১৮৭৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে।

১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্র বহন-প্রদর্শন নিষিদ্ধ

গত ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ঘোষিত তফসিল অনুসারে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্রের বহন-প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকবে। তবে ‘রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী বৈধ অস্ত্রের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগ্নেয়াস্ত্র জমা ও বহনে নিষেধাজ্ঞা একটি নিয়মিত, গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে সহিংসতা ও ভয়ভীতির আশঙ্কা কমে।

যারা বৈধ অস্ত্র জমা দেয়নি, তারা এ নিয়ে ভোটে সহিংসতা করতে চাইলে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
বাহারুল আলম, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)

ঢাকা মহানগরে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে ৩ হাজার ৯৯১ জনের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র জমা পড়েনি।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. ফারুক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব বৈধ অস্ত্র ডিএমপির বিভিন্ন থানায় জমা পড়েনি, সেগুলো এখন অবৈধ অস্ত্র। এসব অস্ত্রের মালিকদের তালিকা করে তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অস্ত্রসহ তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জ সূত্র জানায়, এই রেঞ্জে ২ হাজার ৮৬৪টি বৈধ অস্ত্র জমা পড়েছে। জমা পড়েনি মাত্র চারটি। এসব অস্ত্রের মালিকদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি-ক্রাইম অ্যান্ড ফাইন্যান্স) মো. নাজিমুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাংকে চাকরি করার সময় একজন কর্মকর্তা একটি অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছিলেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি থানায় অস্ত্র জমা দেননি। তিনি ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনে একজন প্রার্থীর দেহরক্ষী হিসেবে ওই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছিলেন। গত রোববার অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অস্ত্র জমা না দিয়ে যাঁরা সেই অস্ত্র দিয়ে সহিংসতা করার পাঁয়তারা করছেন, তাঁদের গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান নাজিমুল হক।

গণ-অভ্যুত্থানে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার

জমা না হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে আওয়ামী লীগের মেয়াদে লাইসেন্স পাওয়া অস্ত্রই বেশি বলে জানা গেছে। এসব অস্ত্রের মালিকদের অনেকেই বিদেশে পালিয়ে গেছেন। দেশের ভেতরে অনেকে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমাতে অনেককে বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ফেনীর নিজাম উদ্দিন হাজারী নিজের নামে একটি করে পিস্তল ও রাইফেলের লাইসেন্স, তাঁর স্ত্রীসহ ফেনীর আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ৩০ জনের নামে রাজনৈতিক বিবেচনায় অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছিলেন। গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভ দমনে এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনী শহরের পাশে মহিপাল এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা গুলি চালালে ৯ জন নিহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়। তখন ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, সেদিন মহিপাল এলাকায় আওয়ামী লীগের অন্তত ৩৩ জনের হাতে বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। তাঁদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা সবাই ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম হাজারীর অনুসারী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগ্নেয়াস্ত্র জমা ও বহনে নিষেধাজ্ঞা একটি নিয়মিত, গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে সহিংসতা ও ভয়ভীতির আশঙ্কা কমে।

অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি-ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, যারা বৈধ অস্ত্র জমা দেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। ভোটে অস্ত্র ব্যবহার করে তারা যাতে সহিসংতা ঘটাতে না পারে, সে জন্য তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা ও কারাগার থেকে ৫ হাজার ৭৪৮টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে এখনো ১ হাজার ৩৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় বিভিন্ন থানায় অস্ত্র আইনে ২ হাজার ৩৯৩টি মামলা করা হয়েছে।

সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব বৈধ অস্ত্র ডিএমপির বিভিন্ন থানায় জমা পড়েনি, সেগুলো এখন অবৈধ অস্ত্র। এসব অস্ত্রের মালিকদের তালিকা করে তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অস্ত্রসহ তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
মো. ফারুক হোসেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস)

‘ভোটে সহিংসতা করতে চাইলেই গ্রেপ্তার’ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি গুলিবিদ্ধ হন। এর পরদিন ১৩ ডিসেম্বর থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরু হয়। ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এ অভিযানে ১৫ হাজার ৯৩৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে চিহ্নিত, পেশাদার ও বড় সন্ত্রাসী খুবই কম। অভিযানে ২৩৬টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।

গত ১১ ডিসেম্বর থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অভিযানে ১৯৩টি আগ্নেয়াস্ত্র অস্ত্র ও ১ হাজার ৯৪১টি গোলাবারুদ উদ্ধারসহ ১ হাজার ৭৭৮ জনকে আটকের কথা জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। গত ১৪ ডিসেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ডিএমপি রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে ২৯টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গতকাল মঙ্গলবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, যারা বৈধ অস্ত্র জমা দেয়নি, তারা এ নিয়ে ভোটে সহিংসতা করতে চাইলে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।