টিটন হত্যার তদন্ত আটকে মুঠোফোনে, দেড় মাসেও শনাক্ত হয়নি খুনি

খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনছবি: পুলিশ সূত্র থেকে পাওয়া

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যা করার দেড় মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, টিটনের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি উদ্ধার হয়নি। তাঁর যোগাযোগ সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই তদন্ত এগোচ্ছে না।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টিটন হত্যাকাণ্ডে অপরাধজগতের কয়েকজন সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল ও সানজিদুল ইসলাম ইমন। তবে কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় হত্যাকাণ্ডে কে জড়িত, তা নির্দিষ্ট করতে পারেননি তদন্তকারী ব্যক্তিরা।

গত ২৮ এপ্রিল রাত পৌনে আটটার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে বটতলায় টিটনকে গুলিতে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০০১ সালে সরকারঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকার ২ নম্বরে ছিল তাঁর নাম।

এ ঘটনায় টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) রমনা বিভাগ।

ঘটনার দিন ওই এলাকায় ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক মোবাইল নম্বর যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র ধরে ম্যানুয়ালি অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানও চালু আছে।
ইরফান খান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবির উপপরিদর্শক

মুঠোফোন ঘিরে তদন্তে জট

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, টিটন হত্যার পরপরই প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু টিটনের ব্যবহৃত মুঠোফোন উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, কে তাঁকে ঘটনাস্থলে ডেকেছিল কিংবা হত্যার আগে তাঁর গতিবিধি কী ছিল—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

পুলিশের ধারণা, যাঁরা ফোন করে টিটনকে নিউমার্কেট এলাকায় নিয়ে এসেছিলেন, তাঁরাই গুলির পর মুঠোফোনটি নিয়ে যান। তবে মামলার বাদী তদন্তকারীদের জানান, টিটন কোনো ফোন নম্বর নিয়মিত ব্যবহার করতেন না। বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কাজেই তাঁর যোগাযোগের নেটওয়ার্ক অনুসরণ করা কঠিন।

আরও পড়ুন

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবির উপপরিদর্শক ইরফান খান প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার দিন ওই এলাকায় ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক মোবাইল নম্বর যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র ধরে ম্যানুয়ালি অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানও চালু আছে। দুই ভাবেই চেষ্টা করা হচ্ছে।

খুনির গতিবিধি রায়েরবাজার পর্যন্ত শনাক্ত

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, টিটনকে লক্ষ্য করে গুলি করেন একজন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরেকজন। মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে আসেন তাঁরা। দুজনের মুখে মাস্ক ছিল। শুটারের মাথায় ছিল ক্যাপ ও পরনে সাদা শার্ট। টিটনের কপাল, মাথা, ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পরপর ছয়টি গুলি করা হয়। হত্যার পর মোটরসাইকেলে খুনিরা দ্রুত পালিয়ে যান।

তদন্তকারী ব্যক্তিরা বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও বিশ্লেষণ করে খুনিদের রায়েরবাজার পর্যন্ত অনুসরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এরপর তাঁরা কোন পথে গেছেন, তা আর শনাক্ত করা যায়নি।

তদন্ত কর্মকর্তা ইরফান খান বলেন, খুনিরা মোটরসাইকেলে মোহাম্মদপুরের দিকে পালিয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে রায়েরবাজারের পর তাঁদের গতিপথ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এখন প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে।

তদন্তে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। কাউকে গ্রেপ্তারের আগে বিস্তারিত কিছুই বলা সম্ভব নয়।
রেজাউল করিম, ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (রমনা) উপকমিশনার

অস্ত্র ব্যবসা ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব

তদন্তসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধের কথা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর বাইরেও তদন্তে অস্ত্র ব্যবসা ও অপরাধী চক্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

টিটন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের শ্যালক। তবে দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। অস্ত্র ব্যবসা ও বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। সম্প্রতি নিউমার্কেট এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও করছিলেন টিটন।

তদন্তকারী ব্যক্তিরা বলছেন, পিচ্চি হেলালের সঙ্গেও টিটনের শত্রুতা পুরোনো। ফলে এই দুই পক্ষের যেকোনো একটি টিটনকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে থাকতে পারে। গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সব সম্ভাবনাকেই আমলে নিয়ে তদন্ত চলছে। এ নিয়ে ডিবির একাধিক দল কাজ করছে।

আরও পড়ুন

টিটন হত্যাকাণ্ডের পেছনে অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বেশির ভাগই দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থেকে অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন। এ কারণে তাঁদের অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সহজ হচ্ছে না।

টিটন হত্যা মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি। তবে সন্দেহভাজন হিসেবে পিচ্চি হেলাল ও তাঁর সহযোগী বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান ও রনি ওরফে ড্যাগারি রনির নাম উল্লেখ রয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় কোরবানির পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ ও ইজারা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে টিটনের বিরোধ চলছিল।

তদন্তকারী ব্যক্তিরা বলছেন, এ তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে হত্যার সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন

কারাগার থেকে বেরিয়ে অপরাধে

দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন টিটন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি। এরপর তিনি অপরাধজগতে নিজের পুরোনো প্রভাব ফেরানো ও নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন টিটন। তিনি প্রথমে স্থানীয় অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন। ধীরে ধীরে অপরাধজগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিটন তাঁর অপরাধ কার্যক্রম বিস্তৃত করেন।

টিটন একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগও রয়েছে, এমনকি তাঁর নেতৃত্বে অস্ত্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা।

২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে টিটনকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

আরও পড়ুন

জামিনে মুক্ত হওয়ার পর টিটনের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে রাজধানীর হাজারীবাগ থানায় এক ইন্টারনেট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনায় করা মামলায় টিটনকেও আসামি করা হয়। এ মামলায় তাঁর দুই ভাইকে আসামি করা হয়। তদন্ত শেষে মামলায় টিটনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (রমনা) উপকমিশনার রেজাউল করিম বলেন, তদন্তে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। কাউকে গ্রেপ্তারের আগে বিস্তারিত কিছুই বলা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন