দ্রুত ধনী হতে ৮ বছরে ৫০০ মোটরসাইকেল চুরি করে চক্রটি
পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সুজুকি জিক্সার মডেলের মোটরসাইকেল চুরি করতেন নুর মোহাম্মদ ও তাঁর চক্রের সদস্যরা। চুরির জন্য চক্রটি বিশেষভাবে মাস্টার কি (নকল চাবি) তৈরি করত। সুযোগ বুঝে সেই নকল চাবি দিয়ে মোটরসাইকেল স্টার্ট করে সেটি নিয়ে পালিয়ে যেতেন তাঁরা। এভাবে পুরান ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে গত আট বছরে অন্তত ৫০০ মোটরসাইকেল চুরি করে চক্রটি। এরপর এগুলো কম দামে বিক্রি করতেন তাঁরা। অল্প সময়ে দ্রুত ধনী হতে তাঁরা এই পথ বেছে নেন বলে জানিয়েছেন।
আজ বুধবার নগরের মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় ডিবি।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর শনির আখড়া ও ধলপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে নূর মোহাম্মদ ও তাঁর চার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে ১৩টি চোরাই মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন চক্রের মূল হোতা নূর মোহাম্মদ (২৬) ও তাঁর সহযোগী রবিন (২৩), সজল (১৮), মনির (২২) ও আকাশ (২২)। আজ নগরীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় ডিবি।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সম্মেলনে বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ধনী হওয়ার নেশায় গত আট বছরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচ শতাধিক মোটরসাইকেল চুরি করেছেন। চুরি করা মোটরসাইকেলগুলোর অধিকাংশই সুজুকি ব্র্যান্ডের জিক্সার মডেলের। রাজধানীর ওয়ারী ও গেন্ডারিয়া থানায় দুটি মোটরসাইকেল চুরির মামলা তদন্ত করতে গিয়ে ঘটনাস্থলের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এ পাঁচ সদস্যকে শনাক্ত করা হয়। উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের মধ্যে সুজুকি ব্র্যান্ডের জিক্সার মডেলের মোটরসাইকেল বেশি।
চুরির কৌশল
চক্রের হোতা নূর মোহাম্মদের বিষয়ে ডিবির কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেন, তিনি মূলত জুরাইন এলাকায় একটি কাঠের দোকানে নকশার কাজ করতেন। আগে তাঁর বাসা ছিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায়। সেখানে এক চায়ের দোকানে রবিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। দুজন মিলে পরিকল্পনা করেন, কীভাবে দ্রুত সময়ে বড়লোক হওয়া যায়। নূর মোহাম্মদ রবিনকে বলেন, তাঁর কাছে করাত ধার দেওয়ার রেত আছে, যা দিয়ে মোটরসাইকেলের চাবি পাতলা করে ‘মাস্টার কি’ বানানো যাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী রবিনের জিক্সার মোটরসাইকেলের চাবি রেত দিয়ে ঘষে পাতলা করে পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটে পার্ক করা একটি জিক্সার মোটরসাইকেল পরীক্ষামূলকভাবে চুরি করেন। এর পর থেকে এ চাবিকেই ‘মাস্টার কি’ হিসেবে ব্যবহার করে দুই বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল চুরি করে আসছেন।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির ওয়ারী বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) মাহফুজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চক্রের প্রধান নূর মোহাম্মদের অন্যতম সহযোগী হলেন মো. রবিন। তাঁরা দুজনই মূলত মোটরসাইকেল চুরি করেন। লক্ষ্যবস্তু বানানো মোটরসাইকেলের আশপাশে তাঁরা ঘোরাঘুরি করে চা পান ও ধূমপান করেন। সুযোগ বুঝে ‘মাস্টার কি’ দিয়ে মোটরসাইকেল চালু করে পালিয়ে যান। অন্য চারজন মোটরসাইকেলের ক্রেতা সংগ্রহ করেন। চুরির পর তাঁরাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে মোটরসাইকেল বিক্রির ব্যবস্থা করতেন।
ডিবি জানায়, চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য অন্যের নামে নিবন্ধন করা সিম ব্যবহার করতেন। এই সিমের নম্বর অন্য কেউ জানতেন না। এসব সিমও ব্যবহার করতেন অল্প দামে কেনা চোরাই মুঠোফোনে। বিভিন্ন অপারেশন নিয়ে তাঁরা নিজেদের মধ্যে মুঠোফোনে কথা বলতেন রাত দুইটার পর। মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে তাঁরা গভীর রাতে যোগাযোগ করতেন।
যেভাবে ধরা হলো মোটরসাইকেল চোর চক্রকে
সাড়ে পাঁচ মাস আগে ওয়ারী থেকে একটি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে। ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ দেখে এক চোর শনাক্ত করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁর সন্ধানের তথ্যদাতা (সোর্স) নিয়োগ করে চলে অনুসন্ধান। একজন তথ্যদাতা ডিবিকে জানান, তিনি শনির আখড়ার এক যুবকের সঙ্গে চোরকে দেখেছেন। শুরু হয় শনির আখড়ায় ওই যুবকের খোঁজ। জানা যায়, ওই যুবক ২০০ গ্রাম গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। চোর চক্র পর্যন্ত পৌঁছাতে তখন পর্যন্ত ডিবির কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। তদন্তও আর এগোচ্ছিল না।
প্রায় সাড়ে চার মাস পর গত জুলাই মাসে শনির আখড়ার ওই যুবক জামিনে ছাড়া পান। এই তথ্য পেয়ে ওই যুবকের সঙ্গে দেখা করে চোরের ছবি দেখান ডিবি কর্মকর্তারা। ছবি দেখেই ওই যুবক চোরকে চিনতে পারেন। জানান, তাঁর (চোর) নাম নূর মোহাম্মদ। শনির আখড়া এলাকাতেই বাসা।
ডিবি কর্মকর্তারা জানান, নূর মোহাম্মদের বিষয়ে তথ্য পেয়েও তাঁকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছিল না। প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা যায়, তিনি একেক সময় একেক জায়গায় অবস্থান করেন। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকা, দোহার, নবাবগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জে তাঁর অবস্থান করার তথ্য পাওয়া যায়। প্রায় এক মাস অপেক্ষার পরও তিনি শনির আখড়ায় তাঁর বাসায় ফিরছিলেন না। গতকাল তথ্য আসে তিনি বাসায় ফিরবেন। বাসায় ফেরার পর অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রায় এক মাসের চেষ্টায় গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার শনির আখড়া থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর জানা গেল, নূর মোহাম্মদ চক্রের প্রধান।
নিরাপদ রুট
হারুন অর রশীদ বলেন, চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রি করার জন্য ঢাকার দোহারে সজলকে তাঁদের চক্রের সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হয়। রাজধানী থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে চক্রটি পোস্তগোলা ব্রিজ পার হয়ে মাওয়া রোডের শ্রীনগর বাইপাস হয়ে মেঘুলা বাজার ও দোহারে যেত। আবার পুরান ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়েও কেরানীগঞ্জ, জয়পাড়া ও দোহার এলাকায় যেত। সজল ও মনির দোহারের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রি করে আসছিলেন।
সজলকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেন, তিনি (সজল) বড়লোক হওয়ার নেশায় দোহারের মেঘুলা বাজারের এক বেকারি ব্যবসায়ীর মেয়েকে পালিয়ে বিয়ে করেন। কিন্তু সেই বিয়ে টেকেনি। সজল হতাশ হয়ে ধনী হওয়ার নেশায় নূর মোহাম্মদ ও রবিনদের চক্রে যোগ দেন। সজল, মনির ও আকাশদের মূল কাজ ছিল দোহার ও আশপাশের এলাকা থেকে চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজে বের করা। প্রতিটি চোরাই মোটরসাইকেল তাঁরা ৪০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করতেন। বিক্রির টাকা নূর মোহাম্মদ ৪০ শতাংশ, রবিন ৩০ শতাংশ ও অন্য সদস্যরা ৩০ শতাংশ পেতেন।
ডিবি জানায়, নুর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা, রবিনের বিরুদ্ধে তিনটি ও অন্য তিনজনের বিরুদ্ধে একটি করে মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।