নির্যাতনের ভিডিও ভাইকে পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘বোনকে নিয়ে যাও’, দুই দিন পরে পেলেন মৃত্যুর খবর
মুক্তা ইসলামকে নির্যাতনের একটি ভিডিও তাঁর ভাই তানভীর রহমানের মুঠোফোনে পাঠিয়েছিলেন স্বামী সোহেল শিকদার। সঙ্গে লিখেছিলেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল পরানো। তাঁকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে পেটানো হচ্ছে। পাশের কক্ষে তখন কাঁদছিল তাঁর দুই সন্তান।
স্বজনেরা পরে খিলক্ষেতের বাসায় গিয়ে মুক্তাকে আর জীবিত পাননি। গত বৃহস্পতিবার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর তাঁকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে মুক্তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন। মামলার প্রধান আসামি ও মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলাটি তদন্ত করছেন উপপরিদর্শক (এসআই) রাজীব ভৌমিক।
মুক্তাকে নির্যাতনের প্রায় তিন মিনিটের একটি ভিডিও পেয়েছে পুলিশ। ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। সোহেল চামড়ার বেল্ট দিয়ে তাঁকে একের পর এক আঘাত করছেন। তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু।’ মুক্তা তখন তাঁকে বলছিলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’
ভিডিওতে মুক্তার শরীরে আঘাতের দাগ দেখা যায়। নির্যাতনের সময় পাশের কক্ষে ছিল তাঁর দুই সন্তান। তাদের কান্না শুনে মুক্তা স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’
পুলিশ বলছে, মারধর করার একটি ভিডিও ১ সেপ্টেম্বর মুক্তার ভাই তানভীরকে পাঠিয়েছিল সোহেল। ভিডিও পাঠিয়ে তাঁর বোনকে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। দুই দিন পরে তাঁরা মুক্তার মৃত্যুর খবর পান। গ্রেপ্তারের পর সোহেলের জব্দ করা মুঠোফোনেও ভিডিওটি পাওয়া গেছে।
পরিবারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক মাস আগে মুক্তার ভাইয়ের কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় মারধর করা হতো—এমন অভিযোগ করছেন তাঁরা। শুধু তা–ই নয়, বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে তাঁর কলহ চলছিল। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ ও যৌতুকের জন্য সোহেল তাঁকে নির্যাতন করতেন—এমন তথ্য তাঁরা পেয়েছেন। তবে মুক্তা নির্যাতনের কথা পরিবারকে তেমন কিছুই বলতেন না।
মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাঁরা খিলক্ষেতে থাকতেন। সোহেল প্রথমে মুদিদোকান করতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসায় যুক্ত হন। ব্যবসায় ভালো করতে না পারার পর স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য বাড়তে থাকে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
খিলক্ষেত থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজীব ভৌমিক প্রথম আলোকে বলেন, মৃত্যুর দুই দিন আগে মুক্তাকে মারধরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে মারধরের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে মুক্তা ফাঁস নিয়েছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন সোহেল।
রাজীব ভৌমিক আরও বলেন, তদন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সোহেল শিকদারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হছে। মুক্তার পরিবারের সঙ্গেও কথা বলা হবে।