গুমের ঘটনায় ঊর্ধ্বতনদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

সংবাদ সম্মেলনে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্যরা। আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানে তদন্ত কমিশনের কার্যালয়েছবি: পিআইডি

আওয়ামী লীগ শাসনামলের গুমের ঘটনা নিয়ে অনেক কর্মকর্তা তাঁদের অগোচরে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করলেও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন বলেছে, এসব ঘটনায় দায়িত্বশীলদের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে, যা গত রোববার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়। গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবেদনের নানা দিক তুলে ধরেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী।

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের দেড় যুগের শাসনকালে গুমের ঘটনাগুলোর তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে এই কমিশন গঠন করে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে তদন্তে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা নিশ্চিত হয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন।

গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথা কমিশন জানিয়েছে।

‘পূর্বসূরিদের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই’

বিভিন্ন বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা কমিশনের কাছে দাবি করেছিলেন, গুমের ঘটনাগুলো তাঁদের দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ঘটেছে। তাঁরা কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে আটক ব্যক্তিদের বা বন্দিশালা নিয়ন্ত্রণ করেছেন। কমিশন এই যুক্তি খণ্ডন করে বলেছে, কমান্ড পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দায় শেষ হয়ে যায় না; বরং পরবর্তী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ওপর সেই দায় বর্তায়। কোনো বন্দীই রক্ষক ছাড়া থাকতে পারেন না এবং সেই রক্ষক হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দায় এড়াতে পারেন না।

সেনাবাহিনীর নিজস্ব তদন্তেও সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বরখাস্ত) আবদুল্লাহিল আমান আযমীর আট বছরের বন্দিদশার জন্য পরবর্তী মহাপরিচালকদের সমানভাবে দায়ী করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

গুমের ঘটনায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রায়ই দাবি করেন, অধস্তনদের কর্মকাণ্ড বা গোপন বন্দিশালার বিষয়ে তাঁরা জানতেন না। কমিশন এই দাবিও নাকচ করে বলেছে, এটা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘জানার কথা ছিল’। তাঁদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

কমিশন বলেছে, মিন্টো রোডের ডিবি ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) কার্যালয়, র‍্যাব সদর দপ্তর এবং ডিজিএফআইয়ের জেআইসি (আয়না ঘর) এমন জায়গায় অবস্থিত ছিল, যেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষ থেকে বন্দীদের চিৎকার শোনা বা চলাচল নজরে পড়া অসম্ভব ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কক্ষের খুব কাছেই বা একই তলায় বন্দিশালা ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর জবানবন্দিতে বলেন, হুম্মাম কাদের চৌধুরীর (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে) আটকের বিষয়ে তিনি সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। একইভাবে র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন স্বীকার করেন, মীর আহমদ বিন কাসেম আরমানের (মীর কাসেম আলীর ছেলে) আটকের বিষয়টি তিনি জানতেন এবং আগের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ তাঁকে তা জানিয়েছিলেন। আল–মামুন দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় পরবর্তী মহাপরিচালক খুরশিদ হোসেনকেও বিষয়টি জানিয়ে গিয়েছিলেন।

কমিশনের মতে, গুমের ঘটনাগুলো কেবল ‘কয়েকজন বিপথগামী কর্মকর্তার’ কাজ ছিল, এমন দাবিও সঠিক নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের অপহরণ পদ্ধতি, একই ধাঁচের বন্দিশালা এবং র‍্যাব ও ডিজিএফআইয়ের মধ্যে বন্দিবিনিময়ের সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া প্রমাণ করে, এটি একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল। এ ছাড়া গুম করা ব্যক্তিকে পরবর্তী সময়ে বৈধ মামলায় গ্রেপ্তারের জন্য একই ধরনের অভিযোগ ও জোরপূর্বক জবানবন্দি নেওয়ার নিয়মিত চর্চাও এই ব্যবস্থার কাঠামোগত চরিত্রকে স্পষ্ট করে।

আরও পড়ুন

‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছিল’

আওয়ামী লীগের শাসনকালে গুম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছিল বলে মনে করে কমিশন। তাই গুমের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিচ্যুতি নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় প্রতিবেদনে।

গুমকে সন্ত্রাসবাদ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পদ্ধতি মূলত ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের দমনে।

সন্ত্রাসীদের দমনে অবৈধ আটক জরুরি ছিল, এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করে কমিশন বলেছে, প্রমাণের বদলে ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধির ওপর ভিত্তি করে কাউকে আটকে রাখা আইনি ও নৈতিকভাবে ভিত্তিহীন। এই চর্চার ফলে বিচারব্যবস্থায় প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রকৃত সন্ত্রাসীরাও নিজেদের ‘ভিকটিম’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করার বদলে দুর্বল করেছে।

আরও পড়ুন

সামরিক বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ নাকচ

কমিশন কেবল সামরিক বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করছে, এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশন ৯৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও ১০৮ জন সামরিক কর্মকর্তাকে সমন পাঠিয়েছে, যা সংখ্যাগতভাবে প্রায় কাছাকাছি। অপরাধের ধরন ও গোপনীয়তার মাত্রার ভিত্তিতে তদন্ত পরিচালিত হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি পক্ষপাতের ভিত্তিতে নয়।

সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশ তাদের বিচার সেনা আইনে করার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছিল। কমিশন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সেনা আইনে ‘গুম’ কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত নয় এবং সেখানে ঊর্ধ্বতনদের ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটির’ স্পষ্ট বিধান নেই।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন অভ্যন্তরীণ সামরিক তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনায় গঠিত তদন্ত বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছাড়াই কাজ বন্ধ করে দেওয়া এবং সংগৃহীত প্রমাণ ‘গায়েব’ করে দেওয়ার বিষয়টি তুলে কমিশন বলেছে, এটি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তদন্তে বাধা দেওয়ার একটি উদাহরণ।

দেশত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন

তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীনসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার দেশ ছাড়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাসপোর্ট বাতিল ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও ঢাকা সেনানিবাসের মতো সুরক্ষিত এলাকা থেকে তাঁরা কীভাবে পালালেন।

এতে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি এ ঘটনাকে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিশন।

আরও পড়ুন