সাবেক ৭ এমপি ও তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে দুদক ১৬টি মামলা করবে
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাবেক সাত সংসদ সদস্য (এমপি) এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে ভোলা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরীর (শাওন) বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার দুদকের সচিব সাইদুর রহমান খান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
দুদকের অনুমোদন পাওয়া মামলাগুলোর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জ ও আবদুর রউফ, কুষ্টিয়া-১ আসনের রেজাউল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ-৩ আসনের মো. আবু জাহির, ফেনী-৩ আসনের হাজী রহম উল্লাহ, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
যাঁদের বিরুদ্ধে যত টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ
দুদক সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জের বিরুদ্ধে ৬৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন এবং ১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা হচ্ছে। একই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রউফের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ৬০৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং তাঁর স্ত্রী জান্নাতুন নাহারের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৯২ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদক।
কুষ্টিয়া-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রেজাউল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ টাকার তথ্য গোপন এবং ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯২ হাজার ৫৩৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর ছোট ভাই দৌলতপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. বুলবুল আহমেদ টোকেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৩৪ লাখ ১৪ হাজার টাকার তথ্য গোপন ও ১ কোটি ৭৯ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৮ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. আবু জাহিরের বিরুদ্ধে ৭ কোটি ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৭ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন, ৯ কোটি ৩২ লাখ ৭১ হাজার ৫৫৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৪টি ব্যাংক হিসাবে ২২ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৭৫৬ টাকা অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাজি রহম উল্লাহর বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা হচ্ছে।
এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের বিরুদ্ধে প্রায় ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৬৪২ টাকা এবং তাঁর স্ত্রী চৌধুরী রুবিনা ইয়াছমিন লুবনার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার ৫৮৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। স্ত্রীর ওই সম্পদ অর্জনে সহায়তার অভিযোগে নয়নসহ দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ১৮০ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ২১ কোটি ৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮১৪ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে পৃথক মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কাদের মির্জা ও নঈম নিজামের বিরুদ্ধেও মামলার অনুমোদন
দুদক জানায়, নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র আবদুল কাদের মির্জা, তাঁর স্ত্রী আখতার জাহান বকুল ও ছেলে মির্জা মাসরুর কাদের তাশিকের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তিনটি মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে যথাক্রমে ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫০, ১ কোটি ৫০ লাখ ৮৩ হাজার ৪০০ ও ৮১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
যশোরের সাবেক পৌর মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদারের বিরুদ্ধে ২৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪৫ হাজার ২২১ টাকা ও তাঁর স্ত্রী শামীমা শারমিনের বিরুদ্ধে ৬ কোটি ৭২ লাখ ৯ হাজার ৪৫৩ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুটি মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম মাহাবুবুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধেও দুটি মামলার অনুমোদন মিলেছে।
এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের স্বামী বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক নঈম নিজামের বিরুদ্ধেও মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ২ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ১৩৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৯টি ব্যাংক হিসাবে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ ৬১ হাজার ৯১৩ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
নুরুন্নবী চৌধুরীর বিরুদ্ধে চার্জশিট
ভোলা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরীর বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুদক। দুদক সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, বরিশালের ভোলা জেলা কার্যালয়ে মামলাটি করা হয়। এতে নুরুন্নবী চৌধুরী, লালমোহনের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহাগ ঘোষ, তজুমদ্দিনের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সেলিম মিয়াসহ ১৮ জনকে আসামি করা হয়।
দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলায় ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির আওতায় নেওয়া ১১টি প্রকল্পে কোনো কাজ না করেই বরাদ্দের ৩১ লাখ ৭২ হাজার ৩৩৩ টাকা উত্তোলন করা হয়। আরও চারটি প্রকল্পে ৩ লাখ ৩১ হাজার টাকার কাজ কম করে ওই অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৫ লাখ ৩ হাজার ৩৩৩ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাতের অভিযোগে মামলাটি করা হয়। অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় ১৮ আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।