বাড্ডায় বিএনপি নেতা কামরুল হত্যা
তদন্তের শুরুতে গলদঘর্ম, শেষে ভিডিওতে দেখা মুঠোফোন দিল খুনির খোঁজ
রাজধানীতে খুনটি প্রকাশ্যেই হয়েছিল, সিসি ক্যামেরার ভিডিও–ও পাওয়া গিয়েছিল; কিন্তু তারপরও খুনি শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। গুপ্তচরও লাগানো হয়েছিল, তাতেও কোনো ফল আসেনি। এরপর আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকার আরও সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ শুরু হয়। তাতেও যখন খুনিকে চিহ্নিত করা যাচ্ছিল না, তখন এক পুলিশ কর্মকর্তার চোখ আটকে যায় ভিডিওর একটি দৃশ্যে, যেখানে সন্দেহভাজন একজনের হাতে থাকা মুঠোফোনটির পেছনটা দেখা যাচ্ছিল।
এবার তা ধরে শুরু হয় অনুসন্ধান। ওই সময় ওই এলাকায় কারা কারা এই ব্র্যান্ডের মুঠোফোন ব্যবহার করছিলেন, শুরু হয় তার খোঁজ। ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে উদ্ঘাটন করা হয় ঢাকার গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসান সাধন হত্যাকাণ্ডের রহস্য। জানা গেল, বাড্ডা ও গুলশান এলাকার ইন্টারনেট ব্যবসা, কাঁচাবাজারে চাঁদাবাজি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে ঘটেছে এ হত্যাকাণ্ড।
এ হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম তদারকিতে থাকা ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই হত্যার ঘটনাটি একেবারে সূত্রহীন ছিল। ডিবির একজন কর্মকর্তার বুদ্ধিদীপ্ত তদন্তে খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।’
২০২৫ সালের ২৫ মে রাত ১০টার দিকে মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাটে একটি চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসান সাধন। হঠাৎই আগ্নেয়াস্ত্রধারী দুই যুবক তাঁকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যান।
কামরুল হত্যার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় মামলা করেন। থানা–পুলিশ হয়ে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় ডিবি।
দিশাহীন তদন্তে দিশা মিলল মুঠোফোনে
কামরুল হত্যাকাণ্ডের পর পাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহ করেছিল পুলিশ। কিন্তু তাতে খুনিদের চিহ্নিত করা যাচ্ছিল না। এরপর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল তদন্তে নেমে আরও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শুরু করে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়।
ডিবির এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, একটি ফুটেজে দুই শুটারের সঙ্গে আরও দুই ব্যক্তিকে দেখা যায়। তবে হত্যাকারী পর্যন্ত পৌঁছাতে সেই ফুটেজও যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না। তখন এক কর্মকর্তার নজরে পড়ে চারজনের মধ্যে একজনের হাতে মুঠোফোন, তাতে ফোনের পেছনের দিক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সেটির সূত্র ধরেই ফোনের কোম্পানি ও মডেল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
ওই কর্মকর্তা জানান, তারপর ওই সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থল ও আশপাশ এলাকায় এই মডেলের মুঠোফোন কারা কারা ব্যবহার করেছে, তার একটি দীর্ঘ তালিকা সংগ্রহ করা হয়। সেই তালিকা ধরে তদন্তের এক পর্যায়ে সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্ত করা হয়। সেই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের পরই উদ্ঘাটিত হয় কামরুল আহসান সাধন হত্যার রহস্য।
এ হত্যামামলার তদন্তে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মহিতুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকারীদের যেন শনাক্ত করা না যায়, এ জন্য দুই শুটার সঙ্গে মুঠোফোন নিয়ে যাননি। যে চারজনকে দিয়ে হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তাঁদের আগের অপরাধের ইতিহাস নেই। ফলে হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হয়েছে।
মুঠোফানটি খালে ফেলে দিয়েও রক্ষা হয়নি
মুঠোফোনের সূত্রে গ্রেপ্তার ওই ব্যক্তির নাম মিজানুর রহমান মীম। তিনি ঢাকার মেট্রোরেল পরিচালনাকারী মাস ট্রানজিট কোম্পানিতে সেফটি অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ডিবি কর্মকর্তা মহিতুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, হত্যার মিশন বাস্তবায়নের পর মিজানুর রহমান মুঠোফোনটি বাড্ডার একটি খালে ফেলে দিয়েছিলেন।
মহিতুল ইসলাম আরও বলেন, ঘটনার এক মাসের বেশি সময় পর (৮ জুলাই, ২০২৫) কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। গ্রেপ্তারের পর তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের ৮ দিন পর (১২ জুলাই, ২০২৫) হৃদয় চৌধুরী নামের একজনকে ফরিদপুরের নগরকান্দা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর চার দিন পর (১৬ জুলাই, ২০২৫) নেত্রকোনার কলমাকান্দা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সাহেদ হোসেন মুন্না নামের আরেকজনকে।
পুলিশের বক্তব্য অনুসারে, ঘটনার দিন কামরুলকে গুলি করেছিলেন হৃদয় ও মুন্না। মিজানুর এবং অন্য একজন ঘটনাস্থলে থেকে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিলেন। চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে জাহিদ আহমেদ নামের একজনকে শনাক্ত করা গেলেও তাঁকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
খুনের নির্দেশ আসে বিদেশ থেকে
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ডিবি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি নেতা কামরুল হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছেন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মেহেদী হাসান। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। বাড্ডা ও গুলশান এলাকার ইন্টারনেট ব্যবসা, কাঁচাবাজারে চাঁদাবাজি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে মেহেদীর নির্দেশে কামরুলকে হত্যা করা হয়।
ডিবি কর্মকর্তা মহিতুল ইসলাম বলেন, খুন করার জন্য হৃদয় ও মুন্নাকে ভাড়া করা হয়েছিল। মিজানুর ও জাহিদ বাড্ডা এলাকারই বাসিন্দা। তাঁরা দুজনই মেহেদীর ঘনিষ্ঠ। জাহিদের মাধ্যমে হৃদয় ও মুন্নাকে ভাড়া করা হয়।
মহিতুল ইসলাম আরও বলেন, হৃদয়ের নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। মুন্না পেশায় গাড়িচালকের সহকারী। হত্যাকাণ্ডের পর হৃদয় ও মুন্নাকে ৩০ হাজার করে দেওয়া হয়।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম বলেন, হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের পর জানা গেল, এর নেপথ্যে ছিল বিদেশে পলাতক এক শীর্ষ সন্ত্রাসী।
বিরিয়ানি খেয়ে খুনের মিশনে
হৃদয় চৌধুরী এরই মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
হৃদয় চৌধুরীর জবানবন্দি উদ্ধৃত করে তদন্ত–সংশ্লিষ্ট এক ডিবি কর্মকর্তা বলেন, খুন করতে যাওয়ার আগে তাঁরা চারজন গুলশান লিংক রোড গুদারাঘাটের কাছে নয়ন বিরিয়ানি হাউসে বিরিয়ানি খান। কামরুলকে হত্যার পর তাঁরা আবার গুদারাঘাটে মিলিত হন। তারপর জাহিদ আহমেদের সাঁতারকুলের বাসায় গিয়ে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
ডিবি কর্মকর্তা নাসিরুল ইসলাম গত সপ্তাহে প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত শিগগিরই শেষ করে এই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।