পুলিশ সংস্কার না হলে জন–আস্থা ফিরবে না 

বাহারুল আলম

প্রায় দুই দশক ধরে জোরালোভাবে পুলিশ সংস্কারের আলোচনা চলছে। ২০০৭ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। নানা পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সেই সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যায়নি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর পুলিশ কমিশন আবারও কি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল?

পুলিশ সংস্কারের মূল প্রশ্নটি হচ্ছে—পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে মামলা তদন্ত ও পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নির্দেশনার প্রভাব থাকলে পুলিশের প্রতি জন–আস্থা তৈরি হবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তাদের নিরপেক্ষতার ওপর; আর সেই নিরপেক্ষতার ভিত্তি হলো কার্যকর ‘ফাংশনাল ইনডিপেনডেন্স’।

একইভাবে ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতি ঘিরেই পুলিশের ওপর বিভিন্ন পক্ষের খবরদারি  প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পুলিশ জন–আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে ছাত্র–জনতার ওপর গুলি চালিয়েছে।

আরও পড়ুন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিদর্শক থেকে পুলিশ সুপার পর্যন্ত পদগুলোতে নিয়োগ ও বদলির নীতিমালা প্রণীত হয়েছিল। এটি অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফিট লিস্ট প্রণয়ন করে একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন নিয়োগগুলো বাস্তবায়িত হলে গোষ্ঠীস্বার্থের প্রভাব কমানো যেত। এ ধরনের একটি কাঠামোর প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। পরবর্তী সময়ে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশেও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুলিশ কমিশনের অধীনে পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি কার্যকর জবাবদিহি–ব্যবস্থার জন্য পুলিশ সদস্যদের জন্যও অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকা জরুরি, যাতে তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইতে পারেন। এতে কেবল জবাবদিহি নয়, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চাপ ও ক্ষোভও কমবে। বর্তমানে সংশোধিত অধ‍্যাদেশের স্বরূপ কী হবে, তা–ও অনিশ্চিত।

পুলিশপ্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা আনা জরুরি। পুলিশ প্রস্তাব করেছিল, একটি বহুমাত্রিক পুলিশ কমিশন গঠন করা হোক, যেখানে বিচার বিভাগ, সরকার ও বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, সমাজতত্ত্ববিদ—এ রকম অনেকের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এই কমিশন যোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনের নাম সুপারিশ করবে এবং সেখান থেকে আইজিপি নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে প্রক্রিয়াটি যেমন স্বচ্ছ হবে, তেমনি পক্ষপাতের ঝুঁকিও কমবে।

বর্তমান ব্যবস্থায় আইজিপিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ অনেকাংশে কর্তৃপক্ষের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, যা পেশাদারত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ছাড়া একক বিবেচনায় নিয়োগের সুযোগ থাকায় পক্ষপাতের ঝুঁকি থেকেই যায়। অধ্যাদেশে কমিশনকে আইজিপি নিয়োগের সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সে সুপারিশ গ্রহণের বাধ‍্যবাধকতার বিষয়টা ছিল অনিশ্চিত।

একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে, পুলিশ নিজেদের সংস্কারের পক্ষে নয়। বাস্তবে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই বাহিনীর ভেতর থেকে পেশাগত স্বাধীনতার দাবি উঠে এসেছে। কিন্তু সমাজ সেই ডাকে সাড়া দেয়নি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর রাজারবাগে কনস্টেবলরা অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা আর রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ের ঘুঁটি হিসেবে ব‍্যবহৃত হতে চাই না।’ অর্থাৎ সংস্কারের দাবি পুলিশের ভেতর থেকেই এসেছে। অতীতে কেউ কেউ দলীয় আনুগত্য প্রদর্শন করেছে, কিন্তু পুলিশের বড় অংশই এখন এই শৃঙ্খল থেকে মুক্তি চায়। এ জন্য পুলিশকে সমাজবান্ধব একটা পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সংস্কার করতেই হবে।

তবে এই সময়ে এসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—পুলিশ কমিশন অধ‍্যদেশ কীভাবে সংশোধিত হচ্ছে। অতীতে দেখা গেছে, সংস্কারের উদ্যোগ বছরের পর বছর মন্ত্রণালয়ে আটকে থেকেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে অধ‍্যাদেশের প্রাথমিক খসড়া হয়েছিল, আমলাতান্ত্রিক জাঁতাকলে পড়ে তা নখদন্তহীন রূপ লাভ করে। নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটা সংশোধনের মধ‍্য দিয়ে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হোক—এ প্রত‍্যাশা সবার।

অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল কমিশন গঠন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না; সেটিকে কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে। অন্যথায় এটি প্রতীকী কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং পুলিশকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

পুলিশ সংস্কার এখনো একটি অসম্পূর্ণ এজেন্ডা। এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তা না হলে এই আলোচনা আগের মতোই অনিশ্চয়তার চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকবে। আশা করছি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও পুলিশের যে সংস্কারগুলো করা যায়নি, রাজনৈতিক সরকার সেগুলো যুক্ত করে আরও কার্যকর কমিশন করবে। জন–আস্থা অর্জন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সেটি করতেই হবে।