রাজধানীর আদাবর ও চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে হামলা ও জমি দখলের চেষ্টায় গ্রেপ্তার ১৩
রাজধানীর আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ের একটি বাড়ি দখল করতে গিয়ে হামলা ও মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে জমি দখলের চেষ্টায় জড়িত অভিযোগে মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পৃথক এই দুই ঘটনায় জমির মালিকানা নিয়ে মামলার বাদী ও পুলিশের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। দুই মামলায় এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, আদাবর থানা-পুলিশের একটি দল গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় ওই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরে গতকাল রোববার দিবাগত মধ্যরাতে আদাবর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বাড়িতে হামলা মামলার আসামি আবুল কালাম আজাদ, মো. রাসেল, মো. আতিকুল, মো. রাসেল পিয়াদা ও লিয়নকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি সামুরাই (ছুরি) উদ্ধার করা হয়।
আজ ডিএমপির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে জানা যায়, আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ের বাড়িটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন মালিকানা–সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। এ ব্যাপারে আদালতে মামলা চলছে। প্রসঙ্গত, আটতলা ভবন ও জমির মালিকানা দাবি করছেন ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান; আর জমির মালিকানা দাবিদার হলেন হামলা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি খুরশীদ আলম খান। বর্তমানে বাড়িটি আমিনুর রহমানের দখলে রয়েছে।
ডিএমপি জানায়, গত শনিবার সকালে খুরশীদ আলম খানের নেতৃত্বে হাবিবুল্লাহ ওরফে রাসেল, কালামসহ অজ্ঞাতনামা ১৫-২০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি দেশি অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে শ্যামলী হাউজিং লিমিটেডের ৬ নম্বর রোডের ৪১ ও ৪২ নম্বর প্লটের ওপর আটতলা একটি ভবনের প্রধান ফটকে হামলা চালায়। এ সময় তারা ভবনে জোর করে ঢোকার চেষ্টা করে এবং প্রধান ফটকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে দরজা-জানালা ভাঙচুর করে ক্ষতিসাধন করে। ওই ঘটনায় বাড়ির অন্যতম মালিক দাবিদার ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান বাদী হয়ে খুরশীদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে আদাবর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনের জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও জোর করে দখলের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আটতলা ভবনটির মালিক দাবিদার আমিনুর রহমানের ভাগনে ফাহাদ হোসেন বাড়িটির তত্ত্বাবধায়ক। আজ সোমবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার সময় তিনি বাড়ির প্রধান ফটকে ছিলেন। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে মুখে মাস্ক পরা চারজন দুর্বৃত্ত বাড়ি দখল করতে এসে প্রধান ফটক খুলে দিতে বলে। এ সময় খুলে না দেওয়া হলে তারা চাপাতি দিয়ে প্রধান ফটক কোপায়। তারা বাড়ির সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করে। হামলায় মোট ১২–১৫ জন অংশ নেয়। তাদের সবার মুখে মাস্ক ছিল। একপর্যায়ে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে ফোন দিয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়। এরই মধ্যে হামলাকারীরা চলে যায়। অবশ্য আদাবর থানার পুলিশ আসে তিন ঘণ্টা পর।
ফাহাদ হোসেন দাবি করেন, বাড়ির প্রকৃত মালিক তাঁর মামা আমিনুর রহমান। মামার গাড়ির শোরুম ও অ্যাগ্রো ফার্ম রয়েছে। তাঁর মামা এখন অসুস্থ। তিনি বলেন, বাড়ির দলিলসহ সব কাগজ তাঁর মামার নামে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন নিয়ে ২০১৭ সালে আটতলা বাড়ির নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। এরপর তাঁর মামা ওই বাড়িতে ওঠেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ– অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত ভবনটি তাঁর মামার দখলে ছিল। গণ–অভ্যুত্থানের পর ভবনটি খুরশীদ আলম দখল করে নেন। এরপর খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে উচ্ছেদের মামলা করা হয়। গত মার্চে আদালতের নির্দেশে খুরশীদ আলম উচ্ছেদ হওয়ার পর বাড়িটির আবার দখল পান তাঁর মামা।
এ বিষয়ে বাড়ির অন্যতম মালিক দাবিদার খুরশীদ আলম হামলা মামলার প্রধান আসামি। আজ রাতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
খুরশীদ আলম খানের বেয়াই জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, খুরশীদ আলম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে। অথচ মামলায় তাঁকে প্রধান আসামি করে বলা হয়েছে, খুরশীদ আলম খানের নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়েছে।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শ্যামলী হাউজিংয়ের প্রকৃত জমির মালিক তাঁর বেয়াই খুরশীদ আলম। কিন্তু আমিনুর রহমান অবৈধ দখলদার। জমির মালিকানার সপক্ষে তাঁর কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। আমিনুর ঢাকা-১৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত মকবুল হোসেনের শ্যালক। আমিনুরের বৈধ কোনো কাগজপত্র না থাকলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মকবুল হোসেনের প্রভাব খাঁটিয়ে আটতলা ভবন নির্মাণ করা হয়।
তবে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. জুয়েল রানা প্রথম আলোকে বলেন, বাড়ির মালিকানা দাবি করে আমিনুর আদবার থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। তখন বাড়ির মালিকানা দাবি করে আমিনুর রহমান ও খুরশীদ আলম দুজনই এসেছিলেন। বাড়ির মালিক দাবিদার খুরশীদ আলম রাজউকের কাছ থেকে ভবন নির্মাণের অনুমোদনসহ বাড়ির মালিকানার সপক্ষে সব কাগজ দেখিয়েছেন; কিন্তু আমিনুর রহমান বাড়ির মালিকানার সপক্ষে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
পুলিশ কর্মকর্তা জুয়েল রানা বলেন, এজাহারভুক্ত তিন আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে হামলায় গ্রেপ্তার ৮
এদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে বাড়ি ভেঙে জমি দখলের চেষ্টার ঘটনায় করা মামলায় আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
গত শনিবার সকালে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকায় জমি দখলকে কেন্দ্র করে জমির অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, শতাধিক মানুষ কার্যালয়ে ঢুকে একটি কক্ষের তালা ভেঙে বিভিন্ন মাল নিয়ে যাচ্ছেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মোহাম্মদপুর থানা জানায়, গতকাল রোববার চাঁদ উদ্যানের জমির মালিক দাবি করে আনোয়ার হোসেন (রিপন) নামের এক ব্যবসায়ী বাদী হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন।
মামলায় বলা হয়, আনোয়ার হোসেনসহ ৩০ জন ব্যক্তি মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যানের বি ব্লকে ওই জমি কেনেন। ভবন নির্মাণের জন্য ওই জমিতে তৈরি করা অফিস ঘরের দ্বিতীয় তলায় ৩০ মালিক বৈঠক করেন এবং ভবন নির্মাণ করাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজ সেখানে সংরক্ষণ করা হয়। গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে জমির মালিকদের একজন মোস্তাকুর রহমান খানের হুকুমে এজাহারভুক্ত ১০ আসামিসহ ২০-২৫ জন দেশি অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা চাঁদ উদ্যানের তাঁদের দ্বিতীয় তলার অফিস কক্ষে ঢুকে মালামাল ভাঙচুর করেন। তাঁরা অফিসের ক্যাশ বাক্স থেকে ১৫ লাখ টাকা, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন মাল ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজ নিয়ে যায়।
এ ব্যাপারে আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগযোগ করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অভিযুক্ত মোস্তাকুর রহমান খানের মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
জানতে চাইলে আজ রাতে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল হালিম প্রথম আলোকে বলেন, জমির মালিকানা নিয়ে আনোয়ার হোসেনদের সঙ্গে মোস্তাকুরদের বিরোধ চলছে। জমির দখলে রয়েছেন আনোয়ার হোসেনরা। জমি দখল করতে এসে মোস্তাকুররা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটান। এ নিয়ে এজাহারভুক্ত আট আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামিসহ দুজনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।