মাদক বিক্রি হয় খুপরিতে, টাকা যায় ‘বড় ভাইদের’ পকেটে

১১ মে বিকেল। রূপসা নদীর তীর ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে জায়গাটিকে প্রথমে আর দশটা ব্যস্ত ঘাট এলাকার মতোই মনে হলো। নদীর পাশে তরুণ-তরুণীদের ভিড়, ফুটপাতে খাবারের দোকান, চায়ের আড্ডা, নদীর বাতাস আর শহরের কোলাহল। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই দৃশ্য পাল্টাতে থাকে।

নদীর ধারে উঠতি বয়সী অনেকে জড়ো হয়। কোথাও কোথাও গাঁজা সেবন চলে প্রায় প্রকাশ্যেই। মূল সড়কের পশ্চিম দিকের খুপরিগুলো থেকে কেউ কেউ বের হয়ে রেলস্টেশনের দিকে চলে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব ঘর ও আশপাশের দোকানে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক বিক্রি ও হাতবদল হয়।

পরদিন ১২ মে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত একই এলাকায় ঘুরে একই ধরনের দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। ফুটপাতে খাবার বিক্রি করেন—এমন এক ব্যক্তি গল্পে গল্পে বললেন, এখানে মাদক বিক্রি বা সেবন চলে অনেকটা প্রকাশ্যেই।

শতাধিক স্থানে হাতের নাগালে

স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেবল রূপসা ঘাট এলাকা নয়, খুলনা শহরের শতাধিক এলাকায় হাতের নাগালে মাদক পাওয়া যায়। এর মধ্যে রূপসা ঘাট, খালিশপুর, হরিণটানা, সোনাডাঙ্গা, লবণচরা ও দৌলতপুরে মাদকের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকায় ছোট ছোট খুপরিতে মাদক বিক্রি হয়। এর বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় খুচরা বিক্রেতা রয়েছে।

আরও পড়ুন

পুলিশের খুলনা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. রেজাউল হক প্রথম আলোকে বলেন, খুলনায় মাদকের বিস্তার মূলত শহরকেন্দ্রিক। শহরে অলি-গলি বেশি হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যে মাদক লেনদেন করে কারবারিরা সটকে পড়েন। খুলনা শহরসংলগ্ন জেলাগুলোতেও মাদকের প্রকোপ বেশি। শহর থেকেই এগুলো আশপাশের এলাকায় যায়। মাদক এমনভাবে সমাজে মিশে গেছে যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

খুলনা শহরের শতাধিক এলাকায় হাতের নাগালে মাদক পাওয়া যায়। এর মধ্যে রূপসা ঘাট, খালিশপুর, হরিণটানা, সোনাডাঙ্গা, লবণচরা ও দৌলতপুরে মাদকের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকায় ছোট ছোট খুপরিতে মাদক বিক্রি হয়। এর বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় খুচরা বিক্রেতা রয়েছে।

খুলনা মহানগর পুলিশের তালিকায় শহরে ৫৮৪ জন মাদক কারবারির নাম রয়েছে। এর মধ্যে খালিশপুরের ১২৩ জন, হরিণটানার ১০২ জন ও সোনাডাঙ্গা থানার ১০২ জন। কিন্তু তালিকা থাকার পরও মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি নেই বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ। তাঁদের ভাষ্য, কারা মাদক বিক্রি করে, কারা বহন করে, কোন এলাকায় কার নিয়ন্ত্রণ—এসব তথ্য পুলিশের অজানা নয়। তারপরও ‘বড় ভাই’ হিসেবে পরিচিত নিয়ন্ত্রণকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। ধরা পড়েন মূলত বাহক, খুচরা বিক্রেতা বা আসক্ত ব্যক্তিরা।

মাদকের প্রভাব পেশাদার ও সামাজিক অপরাধের পাশাপাশি পারিবারিক অশান্তিরও বড় কারণ হয়ে উঠেছে। গত ১০ এপ্রিল রূপসা উপজেলায় নেশার টাকার জন্য মাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ছেলের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের কাছে ঘটনাটি মাদকের সামাজিক বিপর্যয়ের ভয়াবহ উদাহরণ।

অপরাধজগতের অর্থনীতির ভিত্তি

মাদক কারবার এখন খুলনার অপরাধজগতের অর্থনীতিরও বড় ভিত্তি হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কাছ থেকে ইয়াবা নিয়ে বিক্রি করলে প্রতিটিতে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত লাভ করা যায়। দ্রুত আয়ের এই লোভ দেখিয়ে অনেক রিকশাচালক, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষকেও খুচরা মাদক বিক্রিতে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে অপরাধী চক্র।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সন্ত্রাসী বাহিনী পোষা, মামলা পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ‘ম্যানেজ’ ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া নিশ্চিত করার পেছনেও মাদক কারবারের টাকা ব্যবহৃত হয়। ফলে অপরাধজগতের নগদ অর্থপ্রবাহের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে মাদক।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কারা মাদক বিক্রি করে, কারা বহন করে, কোন এলাকায় কার নিয়ন্ত্রণ—এসব তথ্য পুলিশের অজানা নয়। তারপরও ‘বড় ভাই’ হিসেবে পরিচিত নিয়ন্ত্রণকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। ধরা পড়েন মূলত বাহক, খুচরা বিক্রেতা বা আসক্ত ব্যক্তিরা।

বাহক ধরা পড়ে, নিয়ন্ত্রক আড়ালে

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় উদ্ধার হওয়া মাদকের প্রায় ৯৫ শতাংশই ধরা পড়ে বহনকালে। কোনো বাড়ি বা স্থাপনা থেকে ধরা পড়ে মাত্র ৫ শতাংশ। এই তথ্যই মাদক ব্যবসার ধরন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। বড় চালান খুব কম সময় এক জায়গায় থাকে। দ্রুত হাতবদল হয়। ফলে বহনকারী ধরা পড়ে, কিন্তু যাঁরা টাকা দেন, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন বা খুচরা নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন, তাঁরা আড়ালেই থেকে যান।

আরও পড়ুন

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাদকের চক্রগুলো এখন এমনভাবে কাজ করে যে সেবনকারীরা যেখানে চায়, সেখানেই সরবরাহ করা হয়। আগে নির্দিষ্ট পাড়া, ঘাট বা আড্ডাস্থল ঘিরে অভিযান চালানো যেত। এখন মুঠোফোনে যোগাযোগ, ছোট চালান, মোটরসাইকেল বা রিকশায় সরবরাহ এবং অস্থায়ী বিক্রেতাদের মাধ্যমে মাদক পৌঁছে যাচ্ছে।

খুলনার আলোচিত সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বড় অংশ এই পদ্ধতিতে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, খুলনায় মাদকের বড় অংশ আসে নড়াইল রুট হয়ে। মোল্লাহাট ব্রিজ হয়ে একটি রুট এবং নড়াইল থেকে কালনা ব্রিজ হয়ে আরেকটি রুটে মাদক আসে। নড়াইলের লোহাগড়াকে মাদকের বড় সরবরাহকেন্দ্র বলে উল্লেখ করেছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আহসানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, খুলনার মাদকের নিয়ন্ত্রণ কিছু ব্যক্তির হাতে। এমন ৫-৭ জন আছেন, যাঁদের নামে মামলা নেই, কিন্তু তাঁরাই মাদকের নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁদের অনেকের সামাজিকভাবে পরিচিতি বা প্রভাবও রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর অভিযানে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কয়েকজনকে মাদকসহ গ্রেপ্তারের উদাহরণ আছে। যেমন গত বছরের ২০ জুন অস্ত্র, গুলি, মাদকসহ খুলনা নগরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি সালাউদ্দিন মোল্লা ওরফে বুলবুল, নগর যুবদলের সাবেক সদস্য তৌহিদুর রহমানসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছিল যৌথ বাহিনী। তবে পরে এমন অভিযান খুব কম দেখা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণকারী বা নেপথ্যের ব্যক্তিরা সরাসরি মাদক বহন বা বিক্রির সঙ্গে থাকেন না। রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান ও স্থানীয় প্রভাবের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

নড়াইল রুটে ঢোকে মাদক

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, খুলনায় মাদকের বড় অংশ আসে নড়াইল রুট হয়ে। মোল্লাহাট ব্রিজ হয়ে একটি রুট এবং নড়াইল থেকে কালনা ব্রিজ হয়ে আরেকটি রুটে মাদক আসে। নড়াইলের লোহাগড়াকে মাদকের বড় সরবরাহকেন্দ্র বলে উল্লেখ করেছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

এই পথ দিয়ে আসা মাদক খুলনায় ঢোকার পর দ্রুত ছোট ছোট অংশে ভাগ হয়ে যায়। এরপর স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ ও নিয়ন্ত্রকদের তত্ত্বাবধানে তা খালিশপুর, দৌলতপুর, লবণচরা, রূপসা তীরবর্তী এলাকা, স্টেশনপাড়া, ঘাট ও শ্রমজীবী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। কোনো কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ নিজেরাই মাদক সরবরাহ করে। আবার কোথাও তারা মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে ভাগ নেয়।

খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) পরিসংখ্যানেও মাদকের বিস্তার স্পষ্ট। কেএমপির ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত উদ্ধারজনিত মামলার হিসাবে দেখা যায়, এই সময়ে মোট ৫ হাজার ৩১১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মাদকদ্রব্য উদ্ধারসংক্রান্ত মামলা ৫ হাজার ১২৯টি। অর্থাৎ উদ্ধারজনিত মামলার প্রায় পুরোটাই মাদককেন্দ্রিক।

খুলনা জেলা পুলিশের হিসাবেও একই চিত্র। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৯টি থানায় মাদক উদ্ধারের ঘটনায় ২ হাজার ৮৩২টি মামলা হয়েছে; আসামি করা হয়েছে ৩ হাজার ৫০১ জনকে। এতে বোঝায় মাদক কারবার উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই অধিদপ্তর খুলনায় ৩১৭টি অভিযান করে ৯৩টি মামলা করেছে। যদিও এই পরিসংখ্যান মাদক বিস্তারের আংশিক চিত্র মাত্র।

এই পথ দিয়ে আসা মাদক খুলনায় ঢোকার পর দ্রুত ছোট ছোট অংশে ভাগ হয়ে যায়। এরপর স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ ও নিয়ন্ত্রকদের তত্ত্বাবধানে তা খালিশপুর, দৌলতপুর, লবণচরা, রূপসা তীরবর্তী এলাকা, স্টেশনপাড়া, ঘাট ও শ্রমজীবী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। কোনো কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ নিজেরাই মাদক সরবরাহ করে। আবার কোথাও তারা মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে ভাগ নেয়।

পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

খুলনার মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। একাধিক সূত্রের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে কোনো কোনো পুলিশ সদস্যও মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেন। দীর্ঘদিন ধরে কেএমপিতে থাকা পুলিশের কয়েকজন গাড়িচালকের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি এমন দুজনকে থানার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। গত ৫ মের একটি ঘটনা এসব অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। সেদিন কক্সবাজার থেকে সংগ্রহ করা ৫০ হাজার ইয়াবা বড়ি নিয়ে খুলনায় যাওয়ার সময় চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হন খুলনা জেলা পুলিশের কনস্টেবল আশিকুল ইসলাম।

অবশ্য কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, কোনো সদস্য অপরাধে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

গত ১৭ মার্চের এক আদেশে দৌলতপুর থানার দুই কর্মকর্তার (একজন এসআই ও একজন এএসআই) বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্য’ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে মাদক ব্যবসা টিকে থাকার পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের পাশাপাশি পুলিশের কিছু সদস্যের নীরব সহযোগিতা বড় ভূমিকা রাখে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযানের খবর আগেই পৌঁছে যায়। আবার অনেক সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েও যথাযথ ব্যবস্থা নেয় না।

খুলনা মহানগর পুলিশের একাধিক অভ্যন্তরীণ অফিস আদেশেও মাঠপর্যায়ের পুলিশের এমন ভূমিকার ইঙ্গিত রয়েছে। গত ১৭ মার্চের এক আদেশে দৌলতপুর থানার দুই কর্মকর্তার (একজন এসআই ও একজন এএসআই) বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্য’ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

একই থানার আরেক এসআইয়ের (উপপরিদর্শক) বিষয়ে ১৬ মার্চের এক অফিস আদেশে বলা হয়, পরিচিত সন্ত্রাসী ও হত্যা মামলার আসামিরা পুলিশের সামনে থেকে গুলি ছুড়ে পালিয়ে গেলেও সরকারি অস্ত্র-গুলি থাকা সত্ত্বেও তাদের গ্রেপ্তারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি; বরং ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরীহ ও সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তারের কথা নথিতে এসেছে।

হরিণটানা থানার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। কেএমপির কমিশনার স্বাক্ষরিত গত ১৭ মার্চের এক অফিস আদেশে বলা হয়, সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা পুলিশের সামনে থেকে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও আইনানুগ পদক্ষেপ নেননি, এমনকি বেতারযন্ত্র ব্যবহার করে অন্য থানা বা চেকপোস্টকে সতর্কও করেননি। এই ঘটনায় পুলিশের পাঁচ সদস্যকে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব ঘটনা পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, অপেশাদার আচরণ এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কিছু সদস্যের অস্বচ্ছ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। এতে জনমনে পুলিশের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।

একটা সময় ছিল, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজনের নেতৃত্বে এই মাদক ব্যবসা চলত। সেই সাম্রাজ্য এখন বিএনপি-সমর্থিত স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন দখল করার চেষ্টা করছে। একটা সিন্ডিকেটের জায়গায় আরেকটা সিন্ডিকেট গিয়ে খুনোখুনিও করছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলা সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা

অভিযানে হামলা, মামলায় দুর্বলতা

মাদক ব্যবসার বিস্তার শুধু বিক্রি বা সেবনে সীমাবদ্ধ নেই; অভিযানে গেলেও বাধার মুখে পড়ছেন কর্মকর্তারা। গত ৪ এপ্রিল খুলনার খালিশপুরে একটি অভিযানে গিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অবরুদ্ধ হন। তাঁদের ওপর হামলা হয় এবং মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ৭ এপ্রিল খালিশপুর থানায় মামলা হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে মাদক কারবারিরা কতটা সংগঠিত ও সাহসী হয়ে উঠেছে, এই ঘটনা সেটার বড় উদাহরণ। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, পেছনে শক্তিশালী স্থানীয় আশ্রয় না থাকলে সাধারণত খুচরা বিক্রেতারা এমনভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলার সাহস দেখান না।

খুলনার কয়েকটি এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ঘিরে সংঘাতও বাড়ছে। কোথাও পুরোনো সিন্ডিকেটকে সরিয়ে নতুন গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। কোথাও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো মাদক বিক্রির ভাগ, এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির ওপর দখল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ও আশ্রয় যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলা সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা সময় ছিল, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজনের নেতৃত্বে এই মাদক ব্যবসা চলত। সেই সাম্রাজ্য এখন বিএনপি-সমর্থিত স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন দখল করার চেষ্টা করছে। একটা সিন্ডিকেটের জায়গায় আরেকটা সিন্ডিকেট গিয়ে খুনোখুনিও করছে।’

খুলনায় মাদক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আরেকটি বড় বাধা বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা অঞ্চলের অর্ধেকের বেশি মাদকের আসামি খালাস পেয়ে যান। খুলনা বিভাগে মাদকসংক্রান্ত প্রায় আট হাজার মামলা ঝুলে আছে। বিচার শেষ না হওয়া, সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতা, তদন্তের সীমাবদ্ধতা ও মামলা পরিচালনার ঘাটতির কারণে অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।

কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ছিন্নমূল অনেক মানুষ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। খুলনার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অনেকে এখানে এ ধরনের অপরাধে যুক্ত। বিভিন্ন সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু জামিনে বের হয়ে তাদের অনেকে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে মাদক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

মাদক মামলায় সাধারণত যে ব্যক্তির কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হয়, তাকেই আসামি করা হয়। কিন্তু উদ্ধার হওয়া মাদকের মালিক কে, বিনিয়োগ কার, কারা সরবরাহ করে, গন্তব্য কোথায় —এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক মামলায়ই আসে না।

খুলনা মহানগর পুলিশ বলছে, শহরে যত মামলা হয়, তার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই মাদকসংশ্লিষ্ট। এ বছরের জানুয়ারিতে শহরে মাদকসংশ্লিষ্ট মামলা হয়েছে ৫৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৯টি, মার্চে ৩৯টি ও এপ্রিলে ৪৪টি। তবে পুলিশের অন্যান্য মহানগর ইউনিটের তুলনায় খুলনা মহানগর পুলিশের মাদকের মামলার সংখ্যা কম। অথচ স্থানীয় বাসিন্দা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, খুলনায় মাদকের বিস্তার আগের চেয়ে বেড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের তৎপরতা অনেক সময় লোক দেখানো অভিযানের মতো; মূল নেটওয়ার্কে আঘাত কম। অভিযানও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুচরা পর্যায়ে থেমে যায়।

মাদক, সন্ত্রাস ও রাজনীতির ত্রিভুজ

খুলনার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গেলে মাদককে আলাদা করে দেখা কঠিন। মাদক ব্যবসা থেকে আসা নগদ টাকা সন্ত্রাসী গ্রুপের শক্তি বাড়ায়। আবার সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো মাদক বিক্রি, সরবরাহ, ভাগ-বাঁটোয়ারা ও এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক আশ্রয় থাকলে তাদের দাপট আরও বাড়ে। ফলে মাদক, সন্ত্রাস ও রাজনীতির একটি ত্রিভুজ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় মানুষ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্য বলেন, ‘যে ছেলে মাদক বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়ে, সে শেষ মানুষ। তার পেছনে যে টাকা দেয়, যে এলাকা ভাগ করে, যে রাজনৈতিক ছায়া দেয়—তাদের ধরতে না পারলে কিছুই বদলাবে না।’

রূপসা নদীর তীরে ১১ ও ১২ মে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা খুলনার মাদক পরিস্থিতির শুধু একটি অংশ। নদীর ঘাট, চায়ের দোকান, খুপরি, স্টেশনমুখী পথ—সব মিলিয়ে সেখানে মাদক যেন শহরের স্বাভাবিক চলাচলের সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে নিয়ন্ত্রক, রাজনৈতিক প্রভাব, পুলিশের দুর্বলতা, বিচারহীনতা ও দ্রুত আর্থিক লাভের বিষয়।

খুলনায় মাদক এখন কেবল নেশার সামগ্রী নয়; এটি অপরাধজগতের জ্বালানি। এই জ্বালানি যত দিন বন্ধ করা না যাবে, তত দিন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল ও খুনের চক্রও থামানো কঠিন হবে।