আট মাসে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ

বিএসএফকে মৌখিক ও লিখিতভাবে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে বিজিবি। সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে গত ১৪ জানুয়ারি ১৭ জনকে ঠেলে পাঠায় (পুশ ইন) ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তাঁদের আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আটজন পুরুষ, পাঁচ নারী ও চারটি শিশু।

এর আগে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর ভারতের ওডিশা রাজ্যের হিন্দিভাষী একই পরিবারের ১৪ জনকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে ঠেলে পাঠায় বিএসএফ।

শুধু গোমস্তাপুর বা দর্শনা নয়, গত বছরের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে দেশের ৩২ জেলার সীমান্ত দিয়ে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ। তাঁদের মধ্যে ১২০ জন ভারতের নাগরিক বলে জানিয়েছে বিজিবি।

গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এর পর থেকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাতে শুরু করে বিএসএফ।

ঠেলে পাঠানো হচ্ছে ভারতীয়দেরও

গত ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ভারতের ওডিশা রাজ্যের হিন্দিভাষী ৭৩ বছর বয়সী শেখ আবদুর জব্বারসহ তাঁর পরিবারের ১৪ জনকে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার নিমতলা সীমান্তের কাঁটাতারের পকেট গেট খুলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জোর করে ঠেলে পাঠায় বিএসএফ। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন নারী, পাঁচজন পুরুষ ও চারটি শিশু। পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা কনকনে শীতের মধ্যে পরদিন রাতে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা বাসস্ট্যান্ড থেকে তাঁদের উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেন। ঠেলে পাঠানো অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আবদুর জব্বারের ছেলে হাকিম শেখ (৪৮), শেখ উকিল (৪৫), শেখ বান্টি (৩০), শেখ রাজা (৩৮), শেখ জব্বারের স্ত্রী আলকুনি বিবি (৬৫), শেখ উকিলের স্ত্রী সাগেরা বিবি (৩৬) ও তাঁর মেয়ে শাকিলা (৯), শেখ রাজার স্ত্রী মেহরুন বিবি (২৮) ও তাঁর মেয়ে নাসরিন (১০), ছেলে রোহিত (২), তৌহিদ (১১), হাকিম শেখের স্ত্রী শমশেরি বিবি (৩৪) ও শেখ হোসেনের স্ত্রী গুলশান বিবি (৮০)।

দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, ঠেলে পাঠানো ব্যক্তিরা বলেছেন, তাঁরা ভারতের ওডিশার স্থায়ী বাসিন্দা। তাঁদের কাছ থেকে ভারতীয় নাগরিকত্বের কাগজপত্র, আধার কার্ড ও রেশন কার্ড কেড়ে নেওয়া হয়। জব্বার পুলিশকে জানান, মাসখানেক আগে এক গভীর রাতে পুলিশ তাঁদের পরিবারের ১৪ সদস্যকে ধরে নিয়ে যায়। ভারতের আটগড় জেলখানায় ৩৫ দিন ছিলেন। ২৫ ডিসেম্বর তাঁরা মুক্তি পান। একই দিন দিবাগত গভীর রাতে বিএসএফের সদস্যরা তাঁদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেন।

মেহেদী হাসান জানান, হাসপাতালে জব্বারের ১৪ সদস্যের পরিবারকে চিকিৎসা করিয়ে জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়। জেলা প্রশাসনের পরামর্শে এক দিন পর বিজিবি জব্বারের পরিবারকে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে আবার ফেরত পাঠায় (পুশ ইন)।

গত ২০ আগস্ট বিএসএফ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ধীতোরা গ্রামের বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বিবি, তাঁর স্বামী, সন্তানসহ ছয় সদস্যের পরিবারকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠায়।

ভারতের নাগরিক হওয়ার যাবতীয় প্রমাণ সাপেক্ষে ভারতীয় আদালত সোনালী বিবিদের ফেরত আনার নির্দেশ দেন দেশটির সরকারকে। পরে ৫ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে তাঁদের ফেরত পাঠানো হয়। তবে সোনালী বিবির স্বামীকে ফেরত নেয়নি বিএসএফ।

বিজিবির মহানন্দা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক গোলাম কিবরিয়া তখন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বিএসএফের এই অমানবিক পুশ ইন কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পুশ ইন করায় বিএসএফকে মৌখিক ও লিখিতভাবে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে বিজিবি। বিভিন্ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠক করা হচ্ছে। এ ছাড়া সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল তৎপরতা বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। এতে ভারত থেকে পুশ ইন কমে এসেছে বলে জানান তিনি।