রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর: জড়িতদের মধ্যে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতারাও আছেন
রাজধানীর মিরপুরে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সদ্য বহিষ্কৃত নেতা-কর্মীরাও রয়েছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের বাইরেও দলটির স্থানীয় কয়েকজন সাবেক নেতা-কর্মীরও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, হামলার নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তাঁদের এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শুরু থেকেই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় অনেক নেতা-কর্মীর জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তাঁদের অনেকে সদ্য পদত্যাগ করা সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ঘটনার এক সপ্তাহের মাথায় গতকাল তিনি পদত্যাগ করেন।
এর আগের দিন বুধবার রাতে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়। তবে দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডায় হামলার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বহিষ্কারের কারণ হিসেবে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের তথ্য এবং স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের প্রায় সবাই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মী। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভেঙে দেওয়ার পর যে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙানো হয়েছিল, ওই সমিতির সঙ্গেও তাঁদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের তথ্য এবং স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের প্রায় সবাই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মী। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভেঙে দেওয়ার পর যে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙানো হয়েছিল, ওই সমিতির সঙ্গেও তাঁদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, বহিষ্কৃত ১৪ জনের মধ্যে হামলার ঘটনায় শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, দারুসসালাম থানার ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্যসচিব শান্ত রহমান, শাহ আলী থানা অটোরিকশা শ্রমিক দলের সদস্য হুজাইফা এবং দারুসসালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব হাফিজুর রহমানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তবে একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও তাঁদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনার নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাঁদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
গ্রেপ্তার দুজন বিএনপি ও শ্রমিক দলের নেতা
স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত এক সপ্তাহে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তাঁদের মধ্যে একজন বিএনপি ও একজন শ্রমিক দলের নেতা আছেন। তাঁরা বুধবার রাতে গ্রেপ্তার হন। তাঁদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম খোকন (৪৮) শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য এবং মো. আলম (৫৩) শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি। তবে গতকাল রাত পর্যন্ত দল থেকে তাঁদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ দুজন সরাসরি হামলার সঙ্গে জড়িত। ঘটনাস্থলে তাঁদের উপস্থিতির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া যে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির ব্যানারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে, সেই সমিতির চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন সমিতির সম্পাদক শাহ আলম ও অফিস সহকারী শাহাদাত। বাকি দুজন সমিতির সদস্য আতিকুর ও কামরুল।
যে এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটি বহনকারী বড় গাড়ির (লোবেড) চালক শহীদুল ইসলামকেও (৪০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভাঙচুরে ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটর উদ্ধার করা হয়েছে হেমায়েতপুর থেকে। এক্সক্যাভেটর কারা ভাড়া করেছিলেন, তাঁদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন শাহ আলী মাজার এলাকার ভাসমান তরুণ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, টাকার বিনিময়ে তাঁরা ভাঙচুরে অংশ নেন। বাকি পাঁচজনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ ঘটনার নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাঁদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার
নেপথ্যের ব্যক্তিরা ধরা পড়েননি
সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ২৫ সেপ্টেম্বর মামলা হয়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়। এতে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয় লোকজন, ব্যবসায়ী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে সেদিন রাতের ঘটনা সম্পর্কে জানা যায়। ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে হামলার আগে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। পরে তাঁরা সেখান থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা করতে যান।
ঘটনার রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে বি-ব্লক মাঠসংলগ্ন লেলিনের কার্যালয়ের সামনে লোকজন জড়ো হচ্ছেন, যা কাছাকাছি একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সংলগ্ন বিভিন্ন মার্কেটের ফুটেজে ঘটনার সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস ঘুরতে দেখা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, আবুল কালাম ও হানিফের কার্যালয়ের সামনে থেকে এসে হামলাকারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রসংলগ্ন ছিন্নমূল মার্কেটের কাছাকাছি একটি স্থান থেকে লাঠিসোঁটা, রামদা, হাতুড়িসহ দেশীয় অস্ত্র সংগ্রহ করে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার আগে তারা মাথায় কাপড় বাঁধে ও মুখোশ পরে। ঘটনাস্থলে ছিলেন শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াস।
হামলা ও ভাঙচুরের সময় হানিফ মিয়া, আবুল কালাম এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেল, দারুসসালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব হাফিজুর রহমানসহ আরও কয়েকজন নির্দেশনা দেন। তাঁরা একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘুরে ঘুরে নির্দেশনা দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, আবুল কালাম ও হানিফের কার্যালয়ের সামনে থেকে এসে হামলাকারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রসংলগ্ন ছিন্নমূল মার্কেটের কাছাকাছি একটি স্থান থেকে লাঠিসোঁটা, রামদা, হাতুড়িসহ দেশীয় অস্ত্র সংগ্রহ করে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার আগে তারা মাথায় কাপড় বাঁধে ও মুখোশ পরে। ঘটনাস্থলে ছিলেন শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াস।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাদা মাইক্রোবাসে করে কারা এই হামলার তদারক করেছেন, সেই তথ্য তাঁরা পেয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে। যারাই জড়িত থাকুক, আইনের আওতায় আনা হবে। রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে, অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। সেই অনুযায়ী কাজ করছি।’