জবানবন্দিতে দুই পুলিশ সদস্য
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ‘তাইমের মরদেহের কোমরের অংশে ক্ষতচিহ্ন ছিল’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলায় নিহত হয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান (তাইম)। তাঁর মরদেহের কোমরের অংশে ক্ষতচিহ্ন ছিল। দুই পুলিশ সদস্য জবানবন্দিতে এ কথা বলেছেন। তাঁরা জানান, তাঁদের ধারণা, পিস্তলের গুলির কারণে ওই ক্ষত হয়েছিল।
গণ-অভ্যুত্থানের সময় তাইম হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এই ট্রাইব্যুনালে সোমবার তিনজন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা হলেন পুলিশ পরিদর্শক নিজাম উদ্দিন, উপপরিদর্শক (এসআই) মো. দেলোয়ার হোসেন ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. জাহাঙ্গীর আলম। এ নিয়ে এই মামলায় মোট চারজন সাক্ষী জবানবন্দি দিলেন।
সাক্ষী জাহাঙ্গীর আলম ও দেলোয়ার হোসেনের জবানবন্দিতে তাইমের মরদেহের কোমরের অংশে ক্ষতচিহ্ন থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
ইমাম হাসান (তাইম) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে। গণ-অভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। তাইম নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজী নগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তেন।
জবানবন্দিতে এএসআই জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমানে তিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুলিশ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে কর্মরত আছেন। পুলিশের পুরুষ সদস্য এবং তাঁদের বাবাসহ নিকট পুরুষ আত্মীয় মারা গেলে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা রাজারবাগ পুলিশ লাইন মসজিদে মৃতের গোসলের ব্যবস্থা করেন। এরই অংশ হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ২১ জুলাই জোহরের নামাজের পর এসআই (সশস্ত্র) ময়নালের ছেলে তাইমের লাশ রাজারবাগের পুলিশ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নিয়ে আসা হয়।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যখন লাশ গোসলখানায় নেওয়া হয়, তখন মৃতের পরা কাপড় খুলে ফেলা হয়। মৃতের শরীরে ও পায়ে অসংখ্য পেলেটের (ছররা গুলির) চিহ্ন দেখতে পান তিনি। এই চিহ্ন দেখে উপস্থিত সবাই শটগানের গুলি বলে ধারণা করেন। লাশ ওলট-পালট করার সময় লাশের কোমরের নিচে বাঁ পাশের পেছনের ওপরের অংশে একটি ক্ষতচিহ্ন দেখতে পান। এই চিহ্ন তাঁরা উপস্থিত সবাই পিস্তলের গুলি বলে ধারণা করেন।
এসআই দেলোয়ার হোসেন বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় কোনো পুলিশ সদস্য বা তাঁদের পরিবারের কেউ আহত বা নিহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এডিসি (ওয়েলফেয়ার) ফোন করে জানান, এসআই ময়নাল হোসেনের ছেলে তাইম গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে। তিনি তাঁকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
জবানবন্দিতে দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, তিনি ময়নাল হোসেনকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনে পান। সঙ্গে তাঁর শ্যালিকা ছিলেন। ময়নালের শ্যালিকা তাঁকে জানান, সাংবাদিকের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পেরেছেন, তাইম মারা গেছে, কিন্তু লাশ পাচ্ছেন না। তিনি তাইমের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের পাশে অবস্থিত মর্গের মেঝেতে দেখতে পান।
দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি খোলা চোখে তাইমের তলপেট, বুক, উভয় পায়ের হাঁটুর নিচ ও ওপরের অংশ রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পাই। যা শটগানের পেলেটের জখম বলে মনে হয়েছে।’ তিনি জানান, গোসলের সময় তাইমের মরদেহের বাঁ পাশের কোমরের নিচে একটি বড় ক্ষতচিহ্ন দেখতে পান, যা তাঁদের কাছে পিস্তলের গুলির আঘাতের চিহ্ন বলে মনে হয়েছে। তাইমের সুরতহাল প্রতিবেদনে তিনি ২ নম্বর সাক্ষী হিসেবে সই করেন।
এদিকে পুলিশ পরিদর্শক নিজাম উদ্দিন জবানবন্দিতে বলেন, বর্তমানে তিনি ডিএমপির ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স বিভাগে কর্মরত আছেন। এই পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের ২০ জুলাই তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে যান। সেখানে এসআই দেলোয়ার হোসেন, এসআই ময়নাল হোসেন ও তাইমের খালাকে দেখতে পান। পরদিন সকালে তাইমের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। সেখানে তিনি ৩ নম্বর সাক্ষী হিসেবে সই করেন।
এই মামলায় মোট ১১ জন আসামি। কারাগারে আছেন দুজন। তাঁরা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহদাত আলী।
পলাতক আছেন ৯ জন। তাঁরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. ওহিদুল হক ও সাবেক উপপরিদর্শক সাজ্জাদ উজ জামান।