মায়ের সামনে থেকে তিন বছরের শিশুকে অপহরণের ৩০ ঘণ্টা পর উদ্ধার
রাজধানী ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে থেকে তিন বছরের এক শিশুকে অপহরণের ৩০ ঘণ্টা পর গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থেকে উদ্ধার করেছে র্যাব। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে র্যাব চারজনকে ও পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন অপহরণ চক্রের হোতা ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক চান মিয়া (৩৫), তাঁর বাবা নূর মোহাম্মদ (৬৩), মা চান মালা (৫৫), ভাই জাকির হোসেন (৩৩) এবং জাকিরের স্ত্রী কুলসুম বেগম (২৪)।
র্যাব বলেছে, উদ্ধারের পর শিশুটিকে সুস্থ অবস্থায় তার মায়ের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, গত বুধবার বেলা ১১টার দিকে সুমাইয়া আক্তার তাঁর ছেলে শিশুকে চিকিৎসক দেখানোর জন্য রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। ছেলেকে চিকিৎসক দেখানোর পর বেলা একটার দিকে মালিবাগের মৌচাক মার্কেটে যাওয়ার জন্য হাসপাতালের সামনে থেকে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা ভাড়া করেন তিনি। ছেলে পানি পান করতে চাইলে সুমাইয়া কাছের একটি দোকান থেকে পানি কিনছিলেন। ছেলে রিকশার মধ্যে খেলছিল। তিনি ছেলেকে নামাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে নামেনি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, তখন রিকশাচালক বলেন, ‘বাচ্চাটা নামতে চাচ্ছে না, থাক। আপনি বিলটা (পানির দাম) দিয়ে আসেন।’ পানির দাম দিতে দিতে পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখেন, বাচ্চা নিয়ে রিকশাচালক চলে গেছেন। তখন তিনি রিকশার পেছনে পেছনে ছোটেন। কিন্তু রিকশার নাগাল পাননি। এ সময় তিনি ছেলের জন্য কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পরে সুমাইয়া মুগদা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি মুগদা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন এবং ছেলেকে উদ্ধারে র্যাবের সহযোগিতা চান।
র্যাব কর্মকর্তা ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর র্যাব অপহৃত শিশু উদ্ধার এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব-৩–এর একটি দল ও র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা যৌথ অভিযান চালিয়ে মগবাজার ওয়্যারলেস গেটের গ্র্যান্ড প্লাজার কাছ থেকে অটোরিকশাসহ মো. চান মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে চান মিয়া শিশুটিকে অপহরণের কথা স্বীকার করেন।
চান মিয়ার তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল সন্ধ্যা সাতটার দিকে র্যাব-১৩–এর একটি দল গাইবান্ধার পলাশবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে চান মিয়ার বাবা নূর মোহাম্মদ, মা চান মালা, চান মিয়ার ভাইয়ের স্ত্রী কুলসুম বেগমকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় নূর মোহাম্মদের কোলে থাকা শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে চান মিয়া র্যাব কর্মকর্তাদের বলেন, বাবা নূর মোহাম্মদ ও আজাদ নামের এক আত্মীয়কে দিয়ে শিশুটিকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে নিজ বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। চান মিয়ার বিরুদ্ধে গাইবান্ধায় হত্যা মামলা রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার মুগদা এলাকায় মাদক কারবারে যুক্ত থাকায় আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ।
র্যব জানায়, ১২ বছর ধরে সুমাইয়া সপরিবার সুইজারল্যান্ডে ছিলেন। সম্প্রতি তিন সন্তান নিয়ে তিনি দেশে ফিরে এসেছেন এবং ঢাকার সবুজবাগ থানার দক্ষিণগাঁওয়ে থাকছেন। খবর পেয়ে তাঁর স্বামীও আজ সেখান থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
আজ বিকেলে ঢাকার মুগদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমদাদুল ইসলাম (তৈয়ব) প্রথম আলোকে বলেন, সুমাইয়া তার শিশু ছেলেকে উদ্ধারে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সহযোগিতা চান। গতকাল অপহরণে জড়িত অভিযোগে চান মিয়ার ভাই জাকিরকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। পরে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার চান মিয়া, তাঁর বাবা নূর মোহাম্মদ, ভাই জাকির হোসেন ঢাকায় থাকেন। তাঁরা এখানে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান বলে দাবি করেন। চান মিয়ার মা, ভাইয়ের স্ত্রী গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গ্রামে থাকেন।
পুলিশ কর্মকর্তা ইমদাদুল বলেন, অপহরণের ঘটনাটি পরিকল্পিত। অপহৃত শিশুটি প্রথমে গোবিন্দগঞ্জে অপহরণকারীদের বাড়ি রেখেছিলেন। পরে শিশুটি সেখান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সময় চক্রের সদস্যরা ধরা পড়েন। শিশুটিকে তাঁরা হয়তো বিক্রির পাঁয়তারা করছিলেন। চান মিয়া হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পর ঢাকায় পালিয়ে এসে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাতেন।