রাজধানীর ধানমন্ডিতে চিকিৎসক নাফিসা তাবাসসুমের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলার বাদী এটিকে অবহেলাজনিত মৃত্যু, নির্যাতন এবং পরে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করে আলামত গোপনের সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন।
আজ মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে স্বপ্রণোদিত হয়ে এই মামলার আবেদন করেন মো. মশিউর রহমান শাহ নামের এক আইনজীবী। আদালত আবেদনটি গ্রহণ করে আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। পরে যাচাই–বাছাই শেষে মহানগর হাকিম (ম্যাজিস্ট্রেট) জুয়েল রানা মামলাটি গ্রহণ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্তের নির্দেশ দেন। দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক)/১৯৩/১৯৭/২০১/১০৯/৩৪ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। বাদীপক্ষের আইনজীবী ফরহাদ হোসেন প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মামলায় নিহতের স্বামী, শ্বশুরসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন নিহতের স্বামী রহমত রশীদ, শাশুড়ি সিদ্দিকা সুলতানা, শ্বশুর মোহাম্মদ আবদুর রশীদ এবং আত্মীয় সিমু নাসের।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, পড়াশোনা করার সময় সহপাঠী রহমত রশীদের সঙ্গে নাফিসা তাবাসসুমের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পরে তাঁরা বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে দুই বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। নাফিসা অপেক্ষাকৃত কম সচ্ছল পরিবারের হওয়ায় বিয়ের পর থেকেই আসামিরা তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকেন। ক্রমাগত নির্যাতনের কারণে তিনি তীব্র বিষণ্নতায় (ডিপ্রেশন) আক্রান্ত হন। সন্তান প্রসবের পর পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশনসহ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগতে থাকেন তিনি।
চিকিৎসায় অবহেলা ও ফেসবুক পোস্ট
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, নাফিসার স্বামী ও শ্বশুর চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর চিকিৎসায় অবহেলা করা হয়েছে। এমনকি তাঁর এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও আসামিরা অন্যায়ভাবে বাধা দেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে নাফিসা চিকিৎসকদের একটি ফেসবুক গ্রুপেও তাঁর ওপর হওয়া পারিবারিক নির্যাতনের কথা লিখেছিলেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২ জুন থেকে টানা তিন দিন আসামিরা নাফিসাকে কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখেন। এই তিন দিন তাঁকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি এবং তাঁর দুই বছরের সন্তানকেও দেখতে দেওয়া হয়নি। খবর পেয়ে ৪ জুন নাফিসার মা ধানমন্ডিতে মেয়ের ফ্ল্যাটে যান। সেখানে মেয়েকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখে অনুরোধ করলে মেয়ের স্বামী ঘরের তালা খুলে দেন। ঘর থেকে মুক্ত হয়েই নাফিসা তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘মা, আমি ভাত খাব।’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে না নিয়ে আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করতে থাকেন। কাছের কোনো হাসপাতালে না নিয়ে বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই নাফিসার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আসামিরা প্রভাব খাটিয়ে কোনো প্রকার ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি করে একটি মিথ্যা মৃত্যুসনদ (ডেথ সার্টিফিকেট) ইস্যু করান এবং লাশ দাফন সম্পন্ন করেন। এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং আলামত ধ্বংসের চেষ্টা বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী জানান, আজ আদালতের কাছে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আবেদন জানানো হয়েছে।