ফেসবুকে পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা, প্রেমিকার ডাকে দেখা করতে গিয়ে খুন

হত্যার শিকার সাজ্জাদ হোসেনছবি: পিবিআইয়ের সৌজন্যে

ফেসবুকে পরিচয় থেকে প্রেমের সম্পর্কে। আদান-প্রদান হয় ব্যক্তিগত ছবি। একপর্যায়ে এই সম্পর্কের কথা জানতে পারেন স্বামী। এ নিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা হয় স্বামী–স্ত্রী মিলেই হত্যা করবেন প্রেমিককে। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর বছিলার একটি ফাঁকা মেস বাসায় ডেকে তাঁকে হত্যা করা হয়। লাশ ৯ টুকরা করে কার্টনে ভরে ফেলা হয় দুই জেলায়। ঢাকার এক যুবককে হত্যার মামলা তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এসব তথ্য জানিয়েছে।

গত বছরের ৩ এপ্রিল নির্মমভাবে খুন হওয়া এই যুবকের নাম সাজ্জাদ হোসেন (২৪)। সাজ্জাদ ছিলেন মা–বাবার একমাত্র সন্তান। মা–বাবার সঙ্গে সাভারের হেমায়েতপুরের বাসায় থাকতেন। স্থানীয় একটি কলেজ থেকে স্নাতক (সম্মান) শেষ করেন। খুন হওয়ার প্রায় এক বছর আগে রাজধানীর বনানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছিলেন। বাসা থেকে আসা-যাওয়া করে চাকরি করতেন। এর মধ্যেই ফেসবুকে পরিচয় থেকে সুমাইয়া তৃষ্ণা (২৬) নামের ওই তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন তিনি। সুমাইয়ার বাসা ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায়। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। তাঁর স্বামী রোকনুজ্জামান পলাশও (২৬) তাঁর সঙ্গে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বর্ষের শিক্ষার্থী। বছিলা এলাকায় তাঁর মেসে ডেকে নিয়েই সাজ্জাদকে হত্যা করা হয়। বর্তমানে দুজনই কারাগারে বন্দী। সাজ্জাদকে হত্যার মামলায় তাঁদের বিচার চলছে।

সুমাইয়ার সঙ্গে সাজ্জাদের প্রেম এবং পরবর্তী সময়ে সুমাইয়া ও তাঁর স্বামীর ষড়যন্ত্রে সাজ্জাদের খুন হওয়ার এই বিবরণ উঠে এসেছে আদালতে জমা দেওয়া পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে। মামলাটির তদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পুলিশ পরিদর্শক জামাল উদ্দীন। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আছে। অভিযোগপত্রে ৪০ জনকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩১ আগস্ট এই মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য আছে।

ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পরিচয়

পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যার শিকার সাজ্জাদের সঙ্গে সুমাইয়ার পরিচয় হয় একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। হত্যার প্রায় দুই মাস আগে থেকে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ ও প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাঁদের এই সম্পর্ক শারীরিক ঘনিষ্ঠতায়ও গড়ায়।

হত্যাকাণ্ডের পর রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়া ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে রোকনুজ্জামানের বাড়ি। জীবননগর সীমান্ত হয়েই দুজন ভারতে পালানোর চেষ্টা করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দীন জানান, হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস আগে তাঁদের মধ্যে নগ্ন ছবি আদান-প্রদান হয়। সুমাইয়ার জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ মার্চ মেসেঞ্জারে তাঁর স্বামী রোকনুজ্জামান তাঁর কাছে ব্যক্তিগত ছবি চান। ছবি দিতে গিয়ে তিনি ‘সুপ্ত’ নামের একটি আইডিতে দিয়ে দেন। ওই আইডিটি ব্যবহার করতেন সাজ্জাদ। সুমাইয়া দাবি করেন, সেখান থেকেই সুমাইয়া ও সাজ্জাদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়। সাজ্জাদ সুমাইয়াকে ব্ল্যাকমেইল করেন।

তবে সুমাইয়া ও সাজ্জাদের মধ্যে দুই মাসের প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এ সময় দুজন একাধিকবার অন্তরঙ্গ সম্পর্কেও জড়ান। বিষয়টি রোকনুজ্জামান জেনে যাওয়ায় তাঁদের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়। স্বামীর কাছ থেকে প্রকৃত তথ্য লুকাতেই মিথ্যা বলেন সুমাইয়া। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্যই স্বামীর কথায় রাজি হন হত্যার পরিকল্পনায়।

যেভাবে খুন হন সাজ্জাদ

পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়ার মধ্যে উচ্চমাধ্যমিকে লেখাপড়ার সময় থেকেই পরিচয় ছিল। ২০২৩ সালে তাঁরা বিয়ে করেন বলে জানিয়েছেন। তবে তাঁদের এই বিয়ের কথা দুজনের পরিবারের কেউ জানতেন না। দুজন আলাদা থাকতেন। সুমাইয়া পরিবারের সঙ্গে মোহাম্মদপুরে আর রোকনুজ্জামান বছিলার মেসে থাকতেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, ঈদের ছুটিতে কেউ মেসে নেই জানিয়ে সাজ্জাদকে ডেকে নেন সুমাইয়া। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই মেসের গোসলখানায় লুকিয়ে ছিলেন রোকনুজ্জামান। সাজ্জাদ ওই কক্ষে ঢুকে সুমাইয়াকে জড়িয়ে ধরতেই পেছন থেকে এসে ছুরি দিয়ে তাঁর মুখে ও পিঠে আঘাত করেন রোকনুজ্জামান। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে যান সাজ্জাদ।

তদন্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দীন বলেছেন, রোকনুজ্জামান বিভিন্ন সময় সুমাইয়াকে মুখ ঢেকে নগ্ন ছবি ও ভিডিও তৈরিতে বাধ্য করতেন। এ নিয়ে তাঁদের সম্পর্কের টানাপোড়েনও ছিল। অন্যদিকে সাজ্জাদের সঙ্গে সুমাইয়ার সম্পর্ক এবং তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদানের বিষয়টি জানার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

২০২৫ সালের ২ এপ্রিল রাতে একজন রিকশাচালককে ৫০০ টাকা দিয়ে মোবাইলের একটি সিম সংগ্রহ করেন রোকনুজ্জামান। সিমটি ওই রিকশাচালকের নামে নিবন্ধিত ছিল। রোকনুজ্জামানের নির্দেশনায় ওই নম্বর থেকেই সাজ্জাদকে ফোন করে পরদিন সকালে বছিলার ফাঁকা মেসে আসতে বলেন সুমাইয়া। ওই মেসে থাকতেন রোকনুজ্জামান। পরদিন সকালে সাজ্জাদ বছিলার একটি ১০ তলা ভবনের সপ্তম তলার ওই মেসে যান।

তদন্তে উঠে এসেছে, ঈদের ছুটিতে কেউ মেসে নেই জানিয়ে সাজ্জাদকে ডেকে নেন সুমাইয়া। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই মেসের গোসলখানায় লুকিয়ে ছিলেন রোকনুজ্জামান। সাজ্জাদ ওই কক্ষে ঢুকে সুমাইয়াকে জড়িয়ে ধরতেই পেছন থেকে এসে ছুরি দিয়ে তাঁর মুখে ও পিঠে আঘাত করেন রোকনুজ্জামান। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে যান সাজ্জাদ।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রোকনুজ্জামান বলেন, সাজ্জাদের মৃত্যুর পর কক্ষের মেঝে রক্তে ভেসে যায়। তাঁরা প্রথমে লাশ সরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তা সম্ভব না হওয়ায় লাশ টুকরা করার সিদ্ধান্ত নেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, লাশের খণ্ডগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য চালের বস্তা, চটের ব্যাগ, বড় কার্টন ও স্কচটেপ কেনা হয়। পরে খণ্ডিত লাশ তিনটি কার্টনে ভরা হয়। স্কচটেপ দিয়ে কার্টনগুলো ভালোভাবে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ না থাকে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, হত্যার পর লাশ গুম করতে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করেন রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়া। তিনটি কার্টনে লাশের খণ্ডিত অংশ নিয়ে তাঁরা বছিলা থেকে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ার দিকে রওনা হন রাতে। সেখানে রাতের খাওয়া শেষে ফেরার পথে কার্টনগুলো নির্জন স্থানে ফেলে দেন।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, একটি কার্টন নিয়ে যাওয়া হয় মুন্সিগঞ্জের পদ্মা সেতু (উত্তর) থানার মেদিনীমণ্ডল এলাকায়। সেখানে একটি নর্দমায় সেটি ফেলে দেওয়া হয়। অন্য দুটি কার্টন নিয়ে যাওয়া হয় কেরানীগঞ্জে। শুভাঢ্যা ইউনিয়নের পাওয়ার হাউস থেকে মালঞ্চ হাসপাতাল সড়কের পাশে একটি নির্জন নিচু জমিতে কার্টন দুটি ফেলে রেখে চলে যান তাঁরা।

পরদিন ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল কেরানীগঞ্জে ফেলে যাওয়া একটি কার্টন থেকে কুকুর একটি পোঁটলা টেনে বের করে ছিঁড়ে ফেলে। তখনই বেরিয়ে আসে সাজ্জাদের লাশের খণ্ডিত অংশ। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সেগুলো উদ্ধার করে। প্রায় একই সময়ে মুন্সিগঞ্জের পদ্মা সেতু (উত্তর) থানাধীন এলাকা থেকেও অন্য কার্টনটি উদ্ধার করা হয়।

আমার ছেলে খুব ভালো ছিল। ছেলের কোনো শত্রু ছিল না। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।
মোহাম্মদ ইউসুফ আলী, নিহত সাজ্জাদ হোসেনের বাবা

লাশের খণ্ডিত অংশগুলো স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্টের পাশাপাশি হাড়, দাঁত ও নখের নমুনা সংগ্রহ করে পিবিআই। পরে ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত অংশগুলো সাজ্জাদের।

এদিকে সাজ্জাদের খোঁজ না পেয়ে ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল রাতেই সাভার মডেল থানায় একটি জিডি করেন তাঁর বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। লাশ উদ্ধার হওয়ার পর সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

গ্রেপ্তার সুমাইয়া তৃষ্ণা ও তাঁর স্বামী রোকনুজ্জামান পলাশ
ছবি: পিবিআইয়ের সৌজন্যে

যেভাবে খুনি শনাক্ত

সাজ্জাদের খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের পর পিবিআই অনেকটা নিজ উদ্যোগে প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করে। মুঠোফোনের কলের তথ্য, অবস্থান এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ছিল একেবারেই ‘ক্লুলেস’। শুরুতে প্রযুক্তির মাধ্যমে মুঠোফোনে কথা বলার নম্বরগুলো যাচাই করা হয়। এর সূত্র ধরে গ্রেপ্তার হয় ওই রিকশাচালককে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, তাঁর কাছ থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে সিম কিনে নেন অন্য একজন। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার পরে তথ্য পান রোকনুজ্জামানের। ওই সূত্র ধরে আসামি সুমাইয়াকেও শনাক্ত করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়া ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে রোকনুজ্জামানের বাড়ি। জীবননগর সীমান্ত হয়েই দুজন ভারতে পালানোর চেষ্টা করেন।

নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে সুমাইয়া তাঁর ব্যবহৃত সিম ফেনীতে গ্রামের বাড়িতে রেখে দেন। এরপর তিনি গাবতলী হয়ে জীবননগরের উদ্দেশে রওনা হন। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ। এমনকি যে বাসে সুমাইয়া যাচ্ছিলেন, ওই বাসেই যাত্রীবেশে একজন পুলিশ সদস্যও ওঠেন। জীবননগরে বাস থেকে নামার পর ৮ এপ্রিল রাত দেড়টার দিকে সুমাইয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে রোকনুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সুমাইয়ার আইনজীবী মোজ্জাম্মেল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এই মুহূর্তে বিশেষ কিছু বলার নেই। মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে বোঝা যাবে। তাঁর দাবি, অভিযোগপত্রের সঙ্গে আসামির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির অমিল রয়েছে।

ছেলে হত্যার বিচার চান সাজ্জাদের বাবা

ছেলের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ইউসুফ আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর একমাত্র ছেলে ছিল সাজ্জাদ। ঘটনার দিন সকাল আটটার দিকে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন, ছেলে বাসায় নেই। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে সেটিও বন্ধ পান। পরে বাসার ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ দেখে জানতে পারেন, সকাল পৌনে ছয়টার দিকে সাজ্জাদ বাসা থেকে বের হয়ে গেছেন।

সারা দিন ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে সন্ধ্যা সাতটার দিকে থানায় জিডি করেন ইউসুফ আলী। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে খুব ভালো ছিল। ছেলের কোনো শত্রু ছিল না। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।’