মিরপুরে হত্যা মামলার বাদীর বাসায় ককটেল হামলা, আতঙ্কে পরিবার
রাজধানীর মিরপুরে ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিনের বাসা লক্ষ্য করে ককটেল হামলার ঘটনা ঘটেছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে এ হামলা চালানো হয়। এতে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আফরোজ উদ্দিন মিরপুরে আলোচিত ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন হত্যা মামলার বাদী ও তাঁর ছোট ভাই।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ব্যাটারিচালিত একটি রিকশায় দুই সন্ত্রাসী এসে আফরোজ উদ্দিনের বাসা লক্ষ্য করে ককটেল ছুড়ে পালিয়ে যায়। ককটেলটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বাড়ির প্রধান ফটকে থাকা একটি পিকআপের ওপর পড়ে। এ সময় ওই বাড়িতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পিকআপে আগুন ধরে গেলে ওই বাড়ির লোকজন অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার ডিস্টিংগুইশার) ব্যবহার করে আগুন নিভিয়ে ফেলেন।
এ ব্যাপারে আফরোজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ককটেল হামলা চালানোর পর জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’ এবং মিরপুর থানায় ফোন করা হলে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। তারা ককটেলের আলামত সংগ্রহ করে। তিন বলেন, তাঁর ভাইয়ের হত্যা মামলাটি তুলে নিতে একের পর এক হুমকি দিচ্ছিল এজাহারভুক্ত আসামিরা। এর আগে মিরপুর থানায় এ বিষয়ে কয়েকটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। আফতাব উদ্দিন হত্যা মামলাটি বর্তমানে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩–এ বিচারাধীন। আসামিদের বিরুদ্ধে তিনি ও সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। এতে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদত (পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদত হোসেন) ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে মেরে ফেলার পাঁয়তারা করে আসছেন। এর জের ধরেই হামলা চালানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, হত্যা মামলার আসামিরা এই হামলা চালিয়েছেন বলে জানতে পেরেছেন তাঁরা। ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। হামলার ঘটনায় আফরোজ উদ্দিন চাইলে থানায় মামলা করতে পারেন।
২০০৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে নিজ বাসার কাছে ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিনকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। তিন দিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। আফতাব উদ্দিন মিরপুর-১ নম্বরের মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্স পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ওই মার্কেটটি নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে বেশ কটি দোকান ছিল তাঁর। আফতাব নিহত হওয়ার পর তাঁর ভাই আফরোজ উদ্দিন বাদী হয়ে মিরপুর থানায় শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদত, খোরশেদ, ওসমান গনি এবং তাঁদের ১৩ সহযোগীর নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করা হয়। মোটা অঙ্কের চাঁদা না দেওয়ায় আফতাবকে হত্যা করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। র্যাব-৪ তদন্ত করে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। তাঁদের মধ্যে ৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে ১ নম্বর আসামি ওসমান গনিসহ সাতজন জামিনে মুক্ত হন। শাহাদতসহ ১০ জন পলাতক।
পুলিশ সূত্র জানায়, অভিযোগপত্রভুক্ত শাহাদত ১৪টি হত্যা আর খোরশেদ ১০টি হত্যাসহ ১৩টি মামলার পলাতক আসামি। ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছাইদুর রহমান ওরফে নিউটন হত্যাসহ দুটি মামলায় আদালত শাহাদতকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন। ছাইদুর হত্যা মামলায় খোরশেদও মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত। তাঁরা দুজন বিদেশে পালিয়ে আছেন বলে পুলিশের ধারণা। তাঁদের নামে বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগে পাঁচ শতাধিক জিডি রয়েছে।
আদালত সূত্র জানায়, ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে আফতাব হত্যা মামলার বিচারকাজ চলার মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১০ সালের ৩ অক্টোবর সেটি ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ মামলা হিসেবে চিহ্নিত করে বাতিল করা হয়। এ নিয়ে ওই বছরের ২৯ নভেম্বর প্রথম আলোতে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। তবে অভিযোগপত্রভুক্ত ১৯ আসামির মধ্যে ১ নম্বর আসামি ওসমান গনিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ওই বছর ডিসেম্বরে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন এবং পরের বছর ২৬ জানুয়ারি মামলাটি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার হওয়ার আদেশ বাতিল এবং সব আসামির বিরুদ্ধে মামলা চালানোর নির্দেশ দেন।
এরপর ২০১৬ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ চলার সময় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে মামলাটি নিয়ে আসে। তখন মামলার বাদী আফরোজ উদ্দিন এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের আদেশ স্থগিত করেন। পরে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। মামলাটি এখনো সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।
আফতাবের মা বৃদ্ধা আফরোজা বেগম (৯৯) ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মৃত্যুর আগে অন্তত ছেলে হত্যার বিচারটা যেন দেখে যেতে পারি।’
মামলার বাদী আফরোজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা প্রভাবশালী, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজ। তাঁরা প্রভাব খাটিয়ে এই মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করিয়েছিলেন। সাক্ষ্য গ্রহণের ধার্য তারিখে তাঁরা আদালতে আবেদন করে সময় নিয়ে মামলার তারিখ বারবার পেছাচ্ছেন। এ ছাড়া প্রভাবশালী আসামিদের পক্ষ থেকে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আসামিরা এভাবে ২১ বছর মামলার বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করেছেন। এ অবস্থায় মামলায় ন্যায়বিচার পাবেন কি না, তা নিয়ে তিনি শঙ্কায় আছেন।