আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ বলেন, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল ও সার্বিক তদন্তে এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবির লালবাগ বিভাগ। তিনি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী একটি প্রতিষ্ঠান। নিয়োগ পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে একটি কমিটি করা হয়েছিল। কমিটির সদস্যরা দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেননি। এখানে অনেক লোকের চাকরি হওয়ার কথা। তাঁরা দায় এড়াতে পারেন না। এ ঘটনায় যাঁদের দায় রয়েছে, যাঁরা প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছেন, তাঁদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১০টি পদের লিখিত পরীক্ষা ছিল গত ২১ অক্টোবর বিকেলে। পরীক্ষা শুরুর দেড় ঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে বিমান কর্তৃপক্ষ পরীক্ষাটি স্থগিত ঘোষণা করে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ জানান, আগের দিনই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। বিষয়টি টের পেয়ে পরীক্ষার দিন ডিবির লালবাগ বিভাগ প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতির ঘটনায় ঢাকার বিমানবন্দর ও কাওলা এলাকা থেকে আওলাদ হোসেন (২১), জাহাঙ্গীর আলম (৩৫), এনামুল হক (২৮), হারুন-অর-রশিদ (৪০) ও মাহফুজুল আলম (৩১) নামের বিমানের পাঁচ কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্রের সফট কপি, টাকা, ব্যাংকের চেক, স্ট্যাম্প, মুঠোফোন নম্বর, ডায়েরি ও পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত অভিযোগে বিমানের আরও পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন মো. মাসুদ (৩৪), জাহিদ হোসেন (২৮), সমাজু ওরফে সোবহান (৩০), জাবেদ হোসেন (২৮) এবং জাকির হোসেন (২৯)। গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা, বিভিন্ন ব্যাংকের ৩২টি চেক, ১৭টি নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, ১৪টি মুঠোফোন, মোটরসাইকেল, তিনটি ডায়েরি, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের হার্ড কপি ও সফট কপি এবং নিয়োগপ্রার্থীদের ৫৪টি প্রবেশপত্র জব্দ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ১০ জনের মধ্যে ৯ জন প্রশ্নপত্র ফাঁসে নিজেদের ও অন্যদের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। হারুন-অর-রশিদ বলেন, পরীক্ষা কমিটির প্রধান বিমানের মহাব্যবস্থাপকের (জিএম-প্রশাসন) কক্ষে প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা হয়। সেখান থেকে একজন প্রশ্নপত্রের ছবি তোলেন। ২০ অক্টোবর বিমানের লোগো মুছে ফেলে ৮০টি প্রশ্নে টিক চিহ্ন দিয়ে আরও দুজনের কাছে সরবরাহ করেন। ওই দুজন মোটরসাইকেলে করে চলে যান। এর আগে ১৯ অক্টোবর চূড়ান্ত প্রশ্নপত্রের ফটোকপি করতে এমডির অফিস সহকারী জাহিদ হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি স্মার্টফোন সঙ্গে নিয়ে ফটোকপি করার সময় ছবি তুলে সোবহানের কাছে পাঠিয়ে দেন। সোবহান আরও কয়েকজনের কাছে সেগুলো সরবরাহ করেন।

আদালতে গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে হারুন–অর–রশিদ বলেন, এর আগে বিভিন্ন নিয়োগের সময় একইভাবে তাঁরা বিমান বাংলাদেশের নিয়োগসংক্রান্ত অপকর্ম করেছেন, চুরি করে প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছেন। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি ও যাবতীয় ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে তাঁরা অর্থের বিনিময়ে আগেও অপকর্ম করেছেন। ২১ অক্টোবরও তাঁরা অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন প্রার্থীর কাছ থেকে নগদ টাকা সংগ্রহ, প্রশ্নসহ উত্তরপত্র বিতরণ করেছেন। তাঁরা আরও অনেকের নাম বলেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হারুন–অর–রশিদ বলেন, ১৬৪ ধারায় গ্রেপ্তারদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আরও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে যাঁদের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় এসেছে, তাঁদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে নিয়োগ পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের কাউকে ফোনে, কাউকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।