অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ আদালতে দ্রুত সাজা

চুরি, মুঠোফোন ছিনতাই, মাদক কারবার ও অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার দায়ে গত বছরের ২৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে ২৪ জনকে আটক করেছিল পুলিশ। পরে বিভিন্ন মেয়াদে তাঁদের কারাদণ্ড দেন আদালত।

একই বছরের ১৩ আগস্ট ঢাকায় কারারক্ষী নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগে ২০ প্রার্থীকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁদেরও কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত ৯ মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নানা অপরাধে ১৫ হাজার ১৪২ ফৌজদারি মামলায় ৯ হাজার ৫৮৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন।

ঢাকার পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, ঢাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও প্রচলিত আদালতে মামলার চাপ কমাতে ডিএমপিতে আটটি স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চালু করা হয়েছে। এতে হাতেনাতে ধরা পড়া অপরাধীদের তাৎক্ষণিক সাজা কার্যকর করা হচ্ছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে ঢাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে উদ্যোগ নেয়। সেই লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ডিএমপির আট অপরাধ বিভাগের উপকমিশনারের কার্যালয়ে আটটি স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর আইন মন্ত্রণালয় আটজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে ডিএমপিতে পাঠায়।

ডিএমপি সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের মধ্য থেকে ডিএমপির আটজন অপরাধ বিভাগের উপকমিশনারের দপ্তরে আটজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় স্থাপন করা হয়। ওই বছরের মার্চ থেকে সেখানেই স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকায় চুরি, ছিনতাই, মারামারি, মাদকের ব্যবহার, ইভ টিজিং, অসামাজিক কার্যকলাপ এবং অবৈধভাবে রাস্তা দখল করে প্রতিবন্ধকতার মতো অপরাধগুলো নিয়মিতভাবে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে তাৎক্ষণিক বিচারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গত ৯ মাসে রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগে এসব ঘটনায় স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৫ হাজার ১৪২ নালিশি মামলায় ২৫ হাজার ৪১৮ জনকে আসামি কর হয়। ভুক্তভোগী, আক্রান্ত ব্যক্তি ও পুলিশ এসব মামলার বাদী হন। বিচার কার্যক্রম শেষে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ৯ হাজার ৫৮৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। এ সময় তাঁদের ৮৬ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ৭২৫ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের কার্যক্রম

ডিএমপির কর্মকর্তারা বলেন, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন আদালত পরিচালনার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালত সাধারণত ভেজালবিরোধী অভিযান, অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ ও ট্রাফিক–সংক্রান্ত ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।

ডিএমপির মুখপাত্র, গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অভিযুক্তদের কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতও সাজা দেন।

জানতে চাইলে মিরপুর বিভাগের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. বিলাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ভুক্তভোগী, ঘটনার শিকার বা পুলিশ বাদী হয়ে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করেন। ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ, স্থির ছবি এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে কেউ চাইলে তাঁর পক্ষে আইনজীবীও নিয়োগ দিতে পারেন।

গত বছরের ১২ আগস্ট ঢাকার কারা অধিদপ্তরে কারারক্ষী নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার দায়ে ৮ জনের ১০ মাস করে কারাদণ্ড দেন স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। সাক্ষাৎকারের সময় জানা যায়, ৮ জন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেননি। তাঁদের নাম করে অন্যরা লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃত প্রার্থীরা সাক্ষাৎকার দিতে এলে বিষয়টি ধরা পড়ে। লিখিত পরীক্ষার সময় কারা কর্তৃপক্ষ সব চাকরিপ্রার্থীর ছবি তুলে সংরক্ষণ করে রাখে। সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় সেই ছবি মিলিয়ে দেখা হয়। এভাবে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। জালিয়াতিতে যুক্ত ৮ জন প্রার্থীকে শনাক্ত করার পর বিষয়টি চকবাজার থানা-পুলিশকে জানানো হয়। থানা কর্তৃপক্ষ তাঁদের আটক করে স্পেশাল মেট্রোপলিটন আদালত লালবাগে উপস্থিত করলে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তাঁদের কারাদণ্ড দেন।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে অপরাধীর তাৎক্ষণিক সাজা হওয়ায় ঢাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে এবং আদালতের ওপরও মামলার চাপ কমছে। সাজা খেটে জেল থেকে বেরিয়ে সাধারণত তাঁরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সাহস পান না। তাৎক্ষণিক বিচার না হলে অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিরা আবার অপরাধপ্রবণতায় জড়িয়ে পড়েন।

আইন কর্মকর্তা হিসেবে ডিএমপিতে প্রেষণে নিয়োগ পেয়েছেন জেলা জজ মোহাম্মদ আতাউল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গুরুতর নয় এমন অপরাধের ফৌজদারি কার্যবিধিতে বিচার করছেন স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে জামিনের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে কেউ মহানগর দায়রা জজ আদালতেও আপিল করতে পারবেন।

এ বিষয়ে কথা হয় মানবাধিকারকর্মী নূর খানের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও আদালতে মামলার চাপ কমাতে দ্রুতগতিতে মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ করলে ত্রুটিবিচ্যুতি হতে পারে। মানুষ ন্যায়বিচার থেকে যাতে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময় সারা দেশের আদালতে মামলার চাপ যেভাবে বেড়েছে, তাতে ঢাকায় কয়েকটি বিশেষ আদালত বসিয়ে তা কমানো যাবে না। ঢাকার মতো সারা দেশে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চালু করতে হবে।