ঢাকায় ১৩ মাসে ১১৩ মোটরসাইকেল চুরি, মামলায় গড়িমসি

রাইড শেয়ার প্রচলনের পর ঢাকায় মোটরসাইকেলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। সেই সঙ্গে এই বাহন চুরির ঘটনাও বাড়ছেছবি: প্রথম আলো

গত রমজানের এক শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ঢাকার তুরাগ এলাকার একটি বাসা থেকে একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী রাকিবুল হাসান তুরাগ থানায় মামলা করতে গেলে মামলা নিতে রাজি হয়নি পুলিশ।

রাকিবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলা না নেওয়ায় থানায় একটি অভিযোগ দিয়ে এসেছি। ঈদের পর যোগাযোগ করতে বলেছে।’

তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। ঘটনাটি শুনে ভুক্তভোগীকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

এ তো গেল এখনকার ঘটনা, প্রায় দেড় বছর আগেও এমন ঘটনার নজির পাওয়া গেছে। উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকা থেকে বায়িং হাউসের মালিক রেজাউল করিমের দামি মোটরসাইকেলটি চুরি হয়। এটি এখনো উদ্ধার হয়নি।

পুলিশ মামলা নেয়নি। মোটরসাইকেলটি উদ্ধারেরও কোনো চেষ্টা করেনি।
রেজাউল করিম, ব্যবসায়ী

রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ মামলা নেয়নি। মোটরসাইকেলটি উদ্ধারেরও কোনো চেষ্টা করেনি। তিনি বলেন, তাঁর মোটরসাইকেলে জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো ছিল। তাতে চুরির পর মোটরসাইকেলটির অবস্থান গাজীপুরের কোনাবাড়িতে শনাক্ত করা গিয়েছিল। এসব তথ্য দেওয়ার পরও পুলিশ তাঁর মোটরসাইকেলটি উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র মুহাম্মদ তালেবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চুরির ঘটনায় অবশ্যই নিয়মিত মামলা নিতে হবে এবং উদ্ধার করতে হবে।

কোনো পুলিশ সদস্য মামলা নিতে গড়িমসি করলে তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বলেন তিনি।

ডিএমপি পরিসংখ্যান বলছে, গত জানুয়ারি মাসে ঢাকায় ১৭টি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে। মোটরসাইকেল ছাড়া ট্রাক, প্রাইভেট কার, সিএনজিসহ বিভিন্ন যানবাহন চুরির ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ৩৬টি। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২১ জনকে। তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের ২৮টি যানবাহন উদ্ধার করা হয়েছে।

ডিএমপির তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারিসহ গত ১৩ মাসে ঢাকায় ১১৩টি মোটরসাইকেল চুরির মামলা হয়েছে। এ সময় মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহন চুরির মামলা হয়েছে প্রায় ৪০০টি। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৩২ জনকে। উদ্ধার করা হয়েছে ২২৮টি যানবাহন।

তবে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, মোটরসাইকেল চুরির সব ঘটনায় মামলা হয় না। সেই কারণে মামলার তথ্য দিয়ে চুরির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না।

গত জানুয়ারি মাসে ঢাকায় ১৭টি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে। মোটরসাইকেল ছাড়া ট্রাক, প্রাইভেট কার, সিএনজিসহ বিভিন্ন যানবাহন চুরির ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ৩৬টি। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২১ জনকে। তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের ২৮টি যানবাহন উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের মোটরসাইকেলও উদ্ধার হয়নি

রাজধানীর ভাটারা থানার গ্যারেজ থেকে গত ১০ জানুয়ারি একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে মোটরসাইকেল উদ্ধারসহ আন্তজেলা চোর চক্রের চার সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইব্রাহিম (২৮) ও রহমতুল্লাহ। অন্য দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক।

উত্তরা পূর্ব থানা এলাকা থেকে গত ৩০ জানুয়ারি একজন পুলিশ সদস্যের মোটরসাইকেল চুরি হয়। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। তবে এখনো মোটরসাইকেলটি উদ্ধার হয়নি।

মোটরসাইকেলটি উদ্ধার না হওয়ায় এখন খোদ থানা–পুলিশই মামলাটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে চায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

চুরির ঘটনায় অবশ্যই নিয়মিত মামলা নিতে হবে এবং উদ্ধার করতে হবে।
মুহাম্মদ তালেবুর রহমান, ডিএমপির মুখপাত্র

চুরিতে সক্রিয় একাধিক চক্র

মোটরসাইকেল চুরি করে, এমন কয়েকটি চক্রের খোঁজ পাওয়া যায় পুলিশ কর্মকর্তাদের কথায়। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ দলের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় অন্তত ১০টি চক্র সক্রিয় রয়েছে। সাধারণ প্রতিটি চক্রে ৫ থেকে ১০ জন সদস্য রয়েছে।

তাঁদের ভাষ্যে, আবুল কালাম আজাদ নামের একজন একটি চক্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রায় ২০ বছর ধরে ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরি করে এই চক্র। এই দলে ৩০ থেকে ৩৫ জন রয়েছেন।

শুধু ঢাকায় নয়, আবুল কালাম আজাদের ‘নেটওয়ার্ক’ সারা দেশেই বিস্তৃত বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা। বরিশালের বাকেরগঞ্জের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় ৫০টি চুরির মামলা থাকার তথ্যও দেন তাঁরা।

ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরির আরেকটি চক্রের নেতা হিসেবে মাদারীপুর জেলার শিবচরের বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের নাম জানা যায়।

প্রথম আলো গ্রাফিকস

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, জসিম উদ্দিন ২০১০ সালে ঢাকায় আসেন। মিরপুর ও খিলগাঁও এলাকায় প্রায় তিন বছর তিনি লন্ড্রির দোকানে (পোশাক ধোয়া ও ইস্তিরি করার দোকান) কাজ করেন। ২০১৩ সালে তিনি স্ত্রীর বড় বোনের স্বামী (ভায়রা) শাহ আলমের প্ররোচনায় মোটরসাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। জসিম ও শাহ আলম শুরুতে একটি চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে শাহ আলমকে নিয়ে নিজেই নতুন দল গড়েন। তাঁদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন মো. হারুন (২৮), আশিক বিশ্বাস (১৯), রাজীব (২০) ও মহসীন (২০) ।

জসিমের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় ১৩টি চুরির মামলা থাকার তথ্য পাওয়া যায় পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।

মোটরসাইকেল চুরি করে, এমন কয়েকটি চক্রের খোঁজ পাওয়া যায় পুলিশ কর্মকর্তাদের কথায়। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ দলের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় অন্তত ১০টি চক্র সক্রিয় রয়েছে। সাধারণ প্রতিটি চক্রে ৫ থেকে ১০ জন সদস্য রয়েছেন।

চুরির পর বিক্রি

চুরির মোটরসাইকেল কম উদ্ধার হওয়া প্রসঙ্গে ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, ঢাকা থেকে মোটরসাইকেল চুরির করে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়ে সেগুলো বিক্রি করা হয়। এসব মোটরসাইকেল ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।

ডিবি কর্মকর্তারা বলেন, অনেক সময় চুরির মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ও চেচিস নম্বর পরিবর্তন করে ফেলা হয়। যে কারণে চুরি হওয়া মোটরসাইকেল খুব বেশি উদ্ধার করা যায় না।

আরও পড়ুন