স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগে গত বছর দিনে ৫১ কল, ৮ বছরে সর্বোচ্চ
২০২৪ সালের তুলনায় এই হার ৬৩ শতাংশ বেশি। ৮ বছরের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ।
চলতি বছরের জুনে পেশায় নার্স এক নারী স্বামীর সঙ্গে গোপালগঞ্জে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে দাম্পত্য কলহের এক পর্যায়ে স্বামী তাঁকে মারধর করেন; ছুরি নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেন এবং পরে একটি ঘরে তালা মেরে আটকে রাখেন। পরদিন ওই গৃহবধূর মামা জাতীয় জরুরি সেবায় কল করলে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করেন।
ওই গৃহবধূ থানায় অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরেই স্বামী তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করছিলেন। ১৪ বছরের সংসারে তাঁদের এক সন্তান রয়েছে।
২০২৪ সালে রাজধানীর ভাটারা এলাকায় এক গৃহবধূকে মাঝরাতে মারধর করে স্বামী বাসা থেকে বের করে দেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে (৯৯৯) কল দিলে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে আত্মীয়ের বাড়িতে পৌঁছে দেয়।
স্বামীর হাতে এমন নির্যাতনের অভিযোগে ২০২৫ সালে ৯৯৯ নম্বরে দিনে গড়ে ৫১ কল এসেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই হার ৬৩ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগে কল এসেছিল ১১ হাজার ৪১৮টি, অর্থাৎ দিনে গড়ে ৩১টি। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল দিনে গড়ে ২৭টি।
স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগই বেশি
গত বছর হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, উত্ত্যক্ত করা, আত্মহত্যার প্ররোচনা, আটকে রাখা, স্বামী, মা–বাবা ও অন্যদের হাতে নির্যাতন, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনসহ নানা অভিযোগে নারী নির্যাতনের ঘটনায় মোট ফোন এসেছে ৩২ হাজার ২৮৬টি। এর মধ্যে কেবল স্বামীর নির্যাতনের ঘটনায় কল এসেছে ১৮ হাজার ৬২৬টি। অর্থাৎ মোট কলের মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ ছিল স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ।
চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে নারীর নির্যাতনের অভিযোগে ৬ হাজার ২২৭টি কলের মধ্যে ৩ হাজার ৮০৮টি বা ৬১ শতাংশ কল এসেছে স্বামীর বিরুদ্ধে।
২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর ৯৯৯ প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৮ বছরে স্বামীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগে এটাই সর্বোচ্চ কল। কল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত বছর স্বামীর সহিংসতার বিরুদ্ধে যত কল এসেছে, ২০২২ সালের আগে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে মোট কলও ততসংখ্যক ছিল না।
নারী নির্যাতনের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সরকারের টাস্কফোর্স করে বড় ধরনের কর্মসূচি নেওয়া দরকার। নারীর ওপর নির্যাতন বিষয়ে সমাজের মনস্তত্ত্ব নিরূপণ করা দরকার।বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম
জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯–এর প্রধান অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মহিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অনেক স্বামী স্ত্রীর ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে নির্যাতন করেন। নারী নির্যাতনের ঘটনা ও স্বামীর হাতে নির্যাতনের ঘটনায় অভিযোগ জানিয়ে গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ কল এসেছে গত বছর। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর নারী নির্যাতনের অভিযোগে কল বেড়েছে ৪০ শতাংশ।
মহিউলের মতে, দুটি কারণে কলের সংখ্যা বেড়েছে। এক. তৃণমূল পর্যায়ে ৯৯৯–এর প্রসার বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকে এই সেবার কথা জেনেছেন এবং আস্থা রেখেছেন। দুই. নারীরা নির্যাতনের ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন, তাঁরা প্রতিকার পেতে কল করছেন।
৯৯৯–এর কল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে নারী নির্যাতনের অভিযোগে কল এসেছিল ২৩ হাজার ৩৩টি। এর মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল ১১ হাজার ৪১৮টি। ২০২৩ সালে ২৬ হাজার ৭৯৮টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৯ হাজার ৯১৩টি। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭১২টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৬ হাজার ৫৬০টি। ২০২১ সালে ১২ হাজার ১৬৯টি অভিযোগের কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে ছিল ৩ হাজার ৩৪৮টি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারী নির্যাতনের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সরকারের টাস্কফোর্স করে বড় ধরনের কর্মসূচি নেওয়া দরকার। নারীর ওপর নির্যাতন বিষয়ে সমাজের মনস্তত্ত্ব নিরূপণ করা দরকার। ফলাফল যা আসবে, তার সঙ্গে মিলিয়ে আইন তৈরি, আইনে পরিবর্তন আনা ও আইনের প্রয়োগ করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী নির্যাতনের পক্ষে মত প্রকাশ করা হয়, নারীর প্রতি বৈষম্যকে সমর্থন দেওয়া হয়—এসব মতামত প্রকাশও নারীর প্রতি নির্যাতন ও নারীবিদ্বেষ বাড়ায়।
অভিযোগ করার পর কী হয়
নির্যাতনের ঘটনায় পারিবারিক সহিংসতা (সুরক্ষা ও প্রতিরোধ) আইন, ২০১০ রয়েছে। আর যৌতুকের কারণে নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তো রয়েছেই। গোপালগঞ্জের গৃহবধূর ঘটনা জানতে ২৫ মার্চ টুঙ্গিপাড়া থানায় যোগাযোগ করে জানা যায়, তিনি পারিবারিক সহিংসতা (সুরক্ষা ও প্রতিরোধ) আইন বা অন্য কোনো আইনের আওতায় প্রতিকার চাননি। থানায় শুধু লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।
টুঙ্গিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী ২৮ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ওই ঘটনার পর এ থানায় যোগ দিয়েছেন। ওই ঘটনার খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, বিষয়টি আর এগোয়নি।
দেখা গেছে, ৯৯৯–এর পক্ষ থেকে থানায় যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হলেও আইনি প্রতিকার চাওয়া ও পাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী আইনি প্রতিকার কীভাবে পেতে পারেন, সেই সহায়তা পান না। তাঁদের শুধু তথ্য দিয়ে সহায়তা করা হয়।
অনেক ভুক্তভোগী যথাযথ সেবা পান না—এমন অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯–এর প্রধান মহিউল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীদের থানার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া এবং ভুক্তভোগী সেবা পেয়েছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। ৯৯৯–এর দিক দিয়ে এ বিষয়ে ঘাটতি নেই।
পারিবারিক সহিংসতা, স্বামীর হাতে নির্যাতন ও হত্যার শিকার ও মামলা কম করার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) উপাত্তেও। আসকের তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালে নারীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল। মামলা হয়েছিল ২৪৮টি ঘটনায়। স্বামীর হাতে নির্যাতনের ঘটনা ছিল ২৮টি ও ২১৭টি হত্যার ঘটনা ছিল।
আসকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে পারিবারিক সহিংসতার ৫২৩টি ঘটনার খবর প্রকাশ হয়েছে, মামলা হয়েছে ২১১টি ঘটনায়। এর মধ্যে স্বামীর হাতে ৩৩টি নির্যাতন ও ১৮০টি হত্যার ঘটনা ছিল। ১০টি পত্রিকা, কিছু অনলাইন পোর্টাল ও আসকের নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এই উপাত্ত সংকলিত করা হয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম প্রথম আলোকে বলেন, সংসার ভেঙে যাওয়ার ভয়ে অনেক নারী আইনি প্রতিকার চান না। এ ছাড়া আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে না জানা ও সচেতনতার অভাব রয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা (সুরক্ষা ও প্রতিরোধ) আইনের আওতায় দেশে অভিযোগ করার ঘটনা নেই বললেই চলে। আইনটির প্রয়োগ সম্পর্কে ভুক্তভোগী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে প্রচার বৃদ্ধি করতে হবে।