৮ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ৫টি ওয়ার্ডের আইডি ব্যবহার করে সার্ভারে ঢুকে ৫৪৭টি জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার বিষয়টি জানাজানি হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের পক্ষ থেকে থানাগুলোতে জিডির পর ছায়া তদন্তে নামে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। পরে তারা ওই চারজনকে গ্রেপ্তার করে। আগের দিন রাতে নগরের খুলশী থানায় ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের জন্মনিবন্ধন সহকারী আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন।

এ মামলায় গ্রেপ্তার ওই চারজনকে আজ মঙ্গলবার বিকেলে আদালতে হাজির করা হয়। এর মধ্যে ওই কিশোর ছাড়া বাকি তিনজন জবানবন্দি দেন। সেখানে তাঁরা বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জন্মনিবন্ধন সনদের জন্য তাঁদের বসের (হ্যাকার) সঙ্গে যোগাযোগ করতেন বলে জানান।

এসব বিষয়ে আজ দুপুরে নগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট চট্টগ্রামের উপকমিশনার মঞ্জুর মোরশেদ। তিনি বলেন, আসামিরা চক্রের সদস্য। তাঁরা মাঠপর্যায়ে জন্মনিবন্ধনের আবেদনকারী অভিভাবকদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে নিজেদের পূর্বপরিচিতদের (তাঁদের ভাষায় হ্যাকার) কাছে পাঠিয়ে দেন। এরপর জন্মনিবন্ধন সার্ভারে ঢুকে জাল সনদ প্রস্তুত করে অভিভাবকদের কাছে পাঠিয়ে দেন তাঁরা। চক্রের সদস্যরা কাউন্সিলরের সই জাল করে সনদ প্রিন্ট দেন। একটি সনদের জন্য যেসব শর্ত পূরণ করতে হয়, জালিয়াতির মাধ্যমে তার কোনোটি পূরণ করা হয় না। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্ন সামগ্রী পাওয়া গেছে। এগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।

ফেসবুকে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করে দেওয়ার বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে। ওই গ্রুপে প্রবেশ করে যাঁরা জন্মনিবন্ধন করতে আগ্রহের কথা জানিয়ে যোগাযোগ করেন, তাঁদের চক্রের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া মাঠপর্যায়েও গ্রাহক সংগ্রহ করে থাকেন চক্রের অন্য সদস্যরা।

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ফেসবুকে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করে দেওয়ার বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে। ওই গ্রুপে প্রবেশ করে যাঁরা জন্মনিবন্ধন করতে আগ্রহের কথা জানিয়ে যোগাযোগ করেন, তাঁদের চক্রের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া মাঠপর্যায়েও গ্রাহক সংগ্রহ করে থাকেন চক্রের অন্য সদস্যরা। এ পর্যন্ত চক্রটি পাঁচ হাজারের বেশি ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ করেছে। এদের মতো সারা দেশে আরও একাধিক চক্র ছড়িয়ে রয়েছে। একেকটি চক্রের সদস্যসংখ্যা ৩০ থেকে ১০০।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মঞ্জুর মোরশেদ বলেন, ‘আইডি হ্যাকিং করে জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যুর ঘটনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি এখনো। আমরা অনুসন্ধান চালাচ্ছি।’

সংবাদ সম্মেলনের পর নগর পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় সাংবাদিকদের বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে করা জন্মনিবন্ধন সনদগুলো আংশিক ভুয়া। কারণ, সনদগুলোতে কাউন্সিলরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যে সই রয়েছে, তা জাল। জন্মসনদ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রোহিঙ্গারাও থাকতে পারেন। আবার সাধারণ মানুষও রয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জন্মনিবন্ধনের সার্ভার হ্যাক হয়েছে নাকি পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকে জন্মনিবন্ধন সনদ নেওয়া হয়েছে, তদন্ত করা হচ্ছে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিট চট্টগ্রামের অতিরিক্ত উপকমিশনার আসিফ মহিউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, জালিয়াতির সঙ্গে বিভিন্ন কাউন্সিলরের কার্যালয়ের আশপাশে থাকা বেশির ভাগ কম্পিউটারের দোকানদারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাঁরা ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে তাঁদের বসের (হ্যাকার) সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকেন। কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে। গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

গ্রেপ্তার চারজনকে আজ মঙ্গলবার বিকেলে আদালতে হাজির করা হয়। এর মধ্যে কিশোর ছাড়া বাকি তিনজন জবানবন্দি দেন। সেখানে তাঁরা বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জন্মনিবন্ধন সনদের জন্য তাঁদের বসের (হ্যাকার) সঙ্গে যোগাযোগ করতেন বলে জানান

ঝামেলা এড়াতে অনেক সাধারণ মানুষ এসব চক্রের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়ে থাকেন। এ পন্থায় দিনে দিনেই অনেকে সনদ পেয়ে যান। অনেকে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে সনদ নিয়েছেন চক্রটির কাছ থেকে। নাম ঠিক রেখে বিভিন্ন স্থানের ঠিকানা দেওয়া হচ্ছে সনদে। ফলে সনদধারী ব্যক্তিকে সনদে উল্লেখ করা ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। মুঠোফোন নম্বরও ভুয়া পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে আজ দুপুরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পাহাড়তলী ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে কাউকে আটক করা না হলেও জন্মনিবন্ধন–সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছেন বলে জানান দুদক চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক ফয়সাল কাদের।

এর আগে ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি চসিকের জন্মনিবন্ধন আইডি প্রথম বেহাত হয়। ওই দিন দেশের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের অফিশিয়াল সার্ভারের আপগ্রেডেশনের কাজ চলার সময় হ্যাক করে ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা, ৬ নম্বর চকবাজার ও ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ড কার্যালয়ের নাম ব্যবহার করে ১৮টি জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু করা হয়। এর মধ্যে ১২টি ছিল রোহিঙ্গাদের নামে।

ওই ঘটনায় পতেঙ্গা ও চকবাজার থানায় তিনটি মামলা করেন সংশ্লিষ্ট জন্মনিবন্ধন সহকারীরা। এ ঘটনায় করা মামলায় আজ গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে মো. আরিফ নামের এক কম্পিউটার দোকানিকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম ইউনিট চট্টগ্রামের উপপরিদর্শক স্বপন কুমার সরকার। তিনি সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, আরিফকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হচ্ছে।