এনআইডির তথ্য বিক্রি করে ১১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া ইসির দুই কর্মী গ্রেপ্তার: সিআইডি
নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য বিক্রির অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল বুধবার রাজধানীতে পৃথক অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এনআইডির তথ্য বিক্রি করে তাঁরা ১১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানান সিআইডির কর্মকর্তারা।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের এসব তথ্য জানানো হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ডাটা এন্ট্রি অপারেটর (আউটসোর্সিং) মো. আলামিন (৩৯) ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. হাবীবুল্লাহ (৪১)। গত বছরের মার্চে পল্টন থানায় সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইনে হওয়া একটি মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবুল বাশার তালুকদার বলেন, নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহায়তায় বুধবার রাতে রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন অফিস থেকে আলামিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকা থেকে হাবীবুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে দুটি মুঠোফোন আলামত হিসেবে উদ্ধার করা হয়।
আবুল বাশার বলেন, হাবীবুল্লাহ ২০০৮ সালে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে যোগ দেন। তিনি ২০১৩ সাল থেকে ঢাকায় নির্বাচন কমিশনে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের এপ্রিলে গজারিয়ায় বদলি হন। আলামিন ২০১৬ সাল থেকে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর (আউটসোর্সিং) হিসেবে হাবীবুল্লাহর সঙ্গে ঢাকায় কাজ করেছেন। তাঁর কাছে একটি গোপন আইডি ও পাসওয়ার্ড ছিল। সেটি দিয়ে সহজেই সারা দেশের এনআইডি–সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা যেত।
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, হাবীবুল্লাহর আইডি দিয়ে শুধু গজারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসের অন্তর্ভুক্ত নাগরিকদের তথ্য যাচাই সম্ভব ছিল। ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে হাবীবুল্লাহকে নিজের আইডি ও পাসওয়ার্ড দেন আলামিন। এ জন্য তিনি প্রতি সপ্তাহে চার-পাঁচ হাজার টাকা পেতেন। আর হাবীবুল্লাহ ওই আইডি দিয়ে বিভিন্নজনের জাতীয় পরিচয়পত্রের সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে ২০০-৩০০ টাকায় বিক্রি করতেন।
সিআইডি বলেছে, নির্বাচন কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই আইডি দিয়ে এক সপ্তাহে ১ লাখ ১২ হাজার ১৫০টি এবং ৩০ দিনে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬০৮টি জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দেখা হয়েছে। এসব জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বিক্রি করে প্রায় ১১ কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন হাবীবুল্লাহ। সেই টাকা দিয়ে ঢাকায় নিজস্ব ফ্ল্যাটসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এনআইডির মূল সার্ভারে ঢুকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে আসছিলেন আলামিন ও হাবীবুল্লাহ। সেসব তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হচ্ছিল।
সিআইডি জানায়, এনআইডির তথ্য নানা রকম প্রতারণায় ব্যবহৃত হচ্ছে। নিশানা করা ব্যক্তির মুঠোফোন নম্বর ক্লোন করে ছদ্মপরিচয়ে অসুস্থতার কথা বলে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। কোনো ব্যক্তির কণ্ঠ নকল করে তাঁর নম্বর থেকে কল করে বিদেশের বিমানবন্দরে টিকিট হারিয়ে ফেলার কথা বলে টাকা আদায়ের ঘটনা রয়েছে। এ ছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং সেবা (এমএফএস)–সংক্রান্ত প্রতারণার ক্ষেত্রেও এসব তথ্য ব্যবহার হয়।
সিআইডি কর্মকর্তারা বলেন, গ্রেপ্তার প্রতারক চক্রের এই সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে অর্থের বিনিময়ে ও যোগসাজশে ওটিপি ট্রান্সফারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এনআইডির মূল সার্ভারে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।