লক্ষ্মীকুঞ্জের আশপাশের বাসিন্দারাও এমন মত দিলেন। নগরের পাথরঘাটা আর সি চার্চ রোডের বাড়িটির খোঁজ নিতে গেলে এলাকার লোকজন চিনিয়ে দিলেন। বাড়িটি এলাকায় সবার কাছে পরিচিত। বাড়ির নাম ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’ হলেও সবাই চেনে ওসি প্রদীপের বাড়ি বলে।

default-image

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পর ওই এলাকায় যান এই প্রতিবেদক। একটি চা–দোকানে লোকজনের ভিড় দেখেন। সেখানে কয়েকজন জানালেন, এই আলিশান বাড়িটি ওসি প্রদীপ নিজের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করেছেন।

মানুষ যেমন মনের মতো বাড়ি তৈরি করে, ব্যাপারটা ঠিক সে রকম। দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়, ঘুষ ও দুর্নীতির মধ্যে অর্জিত অর্থে ওসি প্রদীপ বাড়িটি করেছেন। শ্বশুর অজিত কুমার কারনের দুই ছেলে ও এক মেয়ে থাকলেও কাউকে তিনি ছয়তলা বাড়ি দেননি। কেবল বাড়ি নয়, অজিত কুমার কারন মেয়ে চুমকি কারনকে প্রাইভেট কারও দিয়েছেন! আর প্রদীপের ঘুষের টাকায় বাড়িটি নির্মাণের সত্যতা পাওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর আগে মামলাও করে।

প্রদীপের এ ঘটনা থেকে পুলিশসহ সব দুর্নীতিবাজের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ঘুষ–দুর্নীতির সম্পদ একদিন না একদিন ধরা পড়বেই।
আখতার কবির চৌধুরী, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক

সিরামিকের ইটের নান্দনিক দেয়াল, আর ফটক দেখেই মুগ্ধ হতে হয়। চারদিকে সিসি ক্যামেরার নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ছয়তলা ওই বাড়ির প্রতি সিঁড়িতে ছবি দিয়ে সাজানো ও কারুকাজ করা। প্রতিটি ফ্লোর ১ হাজার ৪৫০ বর্গফুট। প্রতি তলায় দুই ইউনিট করে বাসা রয়েছে। আর চতুর্থ তলার দুটি ইউনিট এক করে সেখানে পরিবার নিয়ে থাকতেন ওসি প্রদীপ।

২০১৩ সালের ১ আগস্ট সদর সাব–রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে চুমকিকে তাঁর বাবা অজিত কারন বাড়িটি দান করেন। দানপত্র দলিল নম্বর ১১৮৮২। কিন্তু অজিতের আরও দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তাঁদের কাউকেই কোনো বাড়ি দান করেননি তিনি।

অজিত কুমার কারনের হার্ডওয়্যারের দোকান রয়েছে নগরের আসাদগঞ্জে। তাঁর গ্রামের বাড়ি রাউজানে। ২০০৬ সালে নগরের পাথরঘাটায় জায়গাটি কেনেন অজিত। আর প্রদীপ পুলিশের এসআই পদে নিয়োগ পান ১৯৯৫ সালে। প্রদীপের সঙ্গে চুমকির বিয়ের পর জায়গাটি কেনা হয়। স্থানীয় লোকজন জানান, শ্বশুরের নামে হলেও সবাই জানে জায়গাটা প্রদীপের। কারণ, তিনিই সবকিছু দেখাশোনা করতেন। অজিত অসুস্থ হওয়ায় তাঁর দুই ছেলে তখন দোকানটি করেন।

দুই ছেলে ও এক মেয়েকে ছয়তলা বাড়ি ও গাড়ি না দিয়ে কেন ছোট মেয়ে চুমকিকে দেওয়া হয়েছে, এ প্রশ্নের জবাবে চুমকির আইনজীবী সমীর দাশগুপ্ত বলেন, চুমকিকে বেশি দেখতে পারতেন তাঁর বাবা, তাই দিয়েছেন।

default-image

কেবল লক্ষ্মীকুঞ্জ নয়, ওসি প্রদীপ মাঝেমধ্যে থাকতেন নগরের মুরাদপুর পশ্চিম ষোলশহর এলাকায় ছয় গন্ডা জায়গার ওপর নির্মিত সেমিপাকা একটি বাড়িতে। সেটিও ওসি প্রদীপেরই বাড়ি বলে সবাই জানে। মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কসংলগ্ন জায়গাটিও ওসি প্রদীপের বাড়ি নামে পরিচিত হয়েছে।

২০১৪ সালে প্রদীপ চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পুলিশের অভিবাসন শাখায় কর্মরত থাকাকালে একদল সন্ত্রাসী নিয়ে বিরোধপূর্ণ জায়গাটি দখল করেন। ঘটনার পর পাঁচলাইশ থানার তৎকালীন ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ প্রদীপের নামে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেখানে বলা হয়, বিরোধপূর্ণ জায়গায় দখল নিয়ে প্রদীপের লোকজন নিয়ে অবস্থান পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সদর সাব–রেজিস্ট্রি অফিসে স্ত্রী চুমকি কারনের নামে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৯২ হাজার টাকায় বায়নামুলে বিরোধপূর্ণ জায়গাটি বায়নামুলে নিবন্ধন করে দখলে আছেন প্রদীপ। আর এটি নিয়েছেন স্ত্রী চুমকির নামে।

default-image

স্থানীয় লোকজন জানান, জায়গাটিকে নিয়ে প্রায়ই গোলাগুলি–মারামারি হতো। কেউ দখলে যেতে পারতেন না। ওসি প্রদীপ নেওয়ায় কেউ আসে না আর। চট্টগ্রামের শহরের পাশাপাশি কক্সবাজারের ঝিলংজা এলাকায়ও ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকায় ৭৪০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট নেন প্রদীপের স্ত্রী চুমকি কারন।

ছয়তলা বাড়ির সঙ্গে বাবার কাছ থেকে দানে একটি প্রাইভেট কারও পান চুমকি। কাগজপত্রে দান বললেও বাবার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকায় গাড়িটি কিনে নেন তিনি। এ ছাড়া সাড়ে ১৭ লাখ টাকা মূল্যের একটি মাইক্রোবাস রয়েছে চুমকির। চুমকি উপহার হিসেবে পেয়েছেন ৪৫ ভরি স্বর্ণ।

চুমকির এত সম্পদে অবাক সবাই
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদক কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, চুমকি কারন একজন গৃহিণী। তিনি কমিশন ব্যবসায়ী হিসেবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথম আয়কর রিটার্ন প্রদান করেন। পরবর্তীকালে তিনি মাছের ব্যবসা ও বাড়িভাড়া থেকে আয় দেখিয়ে রিটার্ন দাখিল করে আসছেন। ২০১৩-১৪ বছরে তিনি ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা ও পরবর্তী অর্থবছরে তিনি ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূলধন দেখিয়েছেন। কিন্তু দুদকের তদন্তে কমিশন ব্যবসার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। চুমকি কারন কমিশন ব্যবসার লাইসেন্স, ব্যাংকে লেনদেনের কোনো প্রমাণ এবং সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে ব্যবসা করার জন্য যথাযথ অনুমোদন দেখাতে পারেননি।

দুদক কর্মকর্তা আরও বলেন, সম্পদ বিবরণীতে চুমকি কারন মাছের ব্যবসা থেকে দেড় কোটি টাকা আয় দেখিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ২০০২ সালে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের উত্তর সারোয়াতলী গ্রামে পাঁচটি পুকুর ইজারা বরাদ্দ নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দুদক তদন্তে জানতে পেরেছে, চুমকি কারন একজন গৃহিণী এবং তাঁর স্বামী প্রদীপ ১৯৯৫ সালে পুলিশের উপপরিদর্শক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। ২০০২ সালে তাঁদের ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা সঞ্চিত অর্থ ছিল না। ২০০২ সাল থেকে মাছের ব্যবসা থেকে আয় করার কথা বলা হলেও আয়কর রিটার্নে তিনি সেটা উল্লেখ করেননি। এতে দুদকের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, মাছের ব্যবসা থেকে দেড় কোটি টাকা আয়ের বিষয়টি সঠিক নয়। চুমকি কারন তাঁর স্বামী প্রদীপের অপরাধলব্ধ অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের উদ্দেশ্যে ভুয়া মাছের ব্যবসা দেখিয়েছেন।

২০২০ সালের ২৩ আগস্ট দুদক প্রদীপ ও তাঁর স্ত্রী চুমকির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পত্তি অর্জনের মামলা করেন। পরের বছরের ২৬ জুলাই প্রদীপ ও চুমকির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়, চুমকি কারন গৃহিণী হয়েও কোটিপতি। পাথরঘাটায় ছয়তলা বাড়ি, ষোলশহরে বাড়ি, ৪৫ ভরি সোনা, একটি করে কার ও মাইক্রোবাস, ব্যাংক হিসাব এবং কক্সবাজারের একটি ফ্ল্যাটের মালিক প্রদীপের স্ত্রী চুমকি কারন। তাঁর ৪ কোটি ৮০ লাখ ৬৪ হাজার ৬৫১ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিপরীতে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায় ২ কোটি ৪৪ লাখ ৬৬ হাজার ২৩৪ টাকার। তাঁর ২ কোটি ৩৫ লাখ ৯৮ হাজার ৪১৭ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের সত্যতা পেয়েছে দুদক। এ ছাড়া চুমকি নিজেকে মৎস্য ব্যবসায়ী দাবি করলেও তাঁর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অথচ প্রদীপের নামে কোনো সম্পদই নেই। তাঁর ‘ঘুষ ও দুর্নীতি’র মাধ্যমে অর্জিত অর্থে স্ত্রী এসব সম্পদ অর্জন করেন। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রদীপের স্ত্রীর নামে থাকা গাড়ি, বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে রাখার জন্য গত বছরের ২৯ জুন চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ নির্দেশ দেন।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই টেকনাফের বাহারছড়া তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। এ হত্যা মামলায় প্রদীপসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। গত ৩১ জানুয়ারি এ রায় দেন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, প্রদীপের এ ঘটনা থেকে পুলিশসহ সব দুর্নীতিবাজের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ঘুষ দুর্নীতির সম্পদ একদিন না একদিন ধরা পড়বেই।

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন