আত্মঘাতী শাকিরার দ্বিতীয় বিয়ে জানতেন না বাবা-মা

রাজধানীর আশকোনার সূর্য ভিলার জঙ্গি আস্তানায় আত্মঘাতী নারীর নাম শাকিরা, বাড়ি ভোলায়। তিনি যে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, তা জানতেন না তাঁর মা-বাবাসহ অন্য স্বজনেরা। পুলিশ বলেছে, শাকিরার দ্বিতীয় স্বামীর নাম রাশেদুর রহমান ওরফে সুমন। জেএমবির সদস্য সুমন এখন কারাগারে। সুমনই তাঁকে বিপথগামী করেছেন।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলন শেষে আশকোনায় আত্মঘাতী নারীর পরিচয় প্রকাশ করেন।
আশকোনায় গত শনিবার পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময় আত্মঘাতী ওই বিস্ফোরণে শাকিরার শিশুকন্যা সাবিনা আহত হয়। সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিহত শাকিরার বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার অ্যাওয়াজপুর ইউনিয়নের পশ্চিম অ্যাওয়াজপুর গ্রামে। বাবার নাম শাহে আলম চৌকিদার। মেয়ের জঙ্গি ও আত্মঘাতী হওয়ার খবর পেয়ে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। পরে স্থানীয় পুলিশ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকায় এসেছে। ঢাকায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। আজ বৃহস্পতিবার শাকিরার লাশ শনাক্ত করতে তাঁর ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে যাওয়ার কথা।
ভোলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফউদ্দিন শাহিন বলেন, মেয়েকে শনাক্ত করতে বুধবার শাকিরার বাবাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। শাহে আলম জানতেন, মেয়ে চাকরি করেন। মেয়ে ‘জঙ্গি’ তা জানার পর তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।
চরফ্যাশন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, শাকিরার বাবা অ্যাওয়াজপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। তাঁদের আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ। জমিজমা নিয়েও প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ আছে।
অবশ্য অ্যাওয়াজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুস সালাম পাটওয়ারী বলেন, শাহে আলম চৌকিদার ওয়ার্ডের সাংগঠনিক সম্পাদক।
যোগাযোগ করা হলে শাহে আলম সন্ধ্যায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর চার মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে শাকিরা তৃতীয়। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় কয়েক বছর আগে শাকিরার সঙ্গে মো. ইকবালের বিয়ে হয়। ইকবাল ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলায় ছোটখাটো ব্যবসা করতেন। বিয়ের বছরখানেকের মাথায় ইকবাল ক্যানসারে ভুগে মারা যান। ইকবাল ও শাকিরার সাবিনা নামের এক মেয়ে আছে। স্বামীর মৃত্যুর পর শাকিরা মেয়েকে নিয়ে ভোলায় ফিরে যাননি। মোহাম্মদপুরের একটি ক্লিনিকে কাজ করতেন। কোরবানির ঈদের পর ভোলায় বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন।
শাহে আলম দাবি করেন, মেয়ে যে আবার বিয়ে করেছেন সেই খবর তিনি বা তাঁর পরিবার জানত না। আগে মোটামুটি নিয়মিত বাড়িতে ফোন করে তাঁদের খোঁজ নিলেও কোরবানির ঈদের পর শাকিরা আর যোগাযোগ করেননি। রাশেদুর রহমান ওরফে সুমন নামে যে ব্যক্তিকে শাকিরার স্বামী বলা হচ্ছে, তাঁকে তিনি চেনেন না।
ঢাকা মহানগর পুলিশ বলেছে, গত ২১ নভেম্বর রাশেদুর রহমান ওরফে সুমনসহ তিনজনকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম (সিটি) ইউনিট যাত্রাবাড়ীর কাজলা থেকে গ্রেপ্তার করে। সুমন ডাকাতি করতেন ও সেই অর্থ সাংগঠনিক কাজে ব্যয় করতেন। তিনি এখন কারাগারে।
তিন মাসের চেষ্টায় সূর্য ভিলার জঙ্গি আস্তানার সন্ধান: ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রায় তিন মাসের চেষ্টায় আশকোনার সূর্য ভিলার জঙ্গি আস্তানা পুলিশ চিহ্নিত করে। তিনি বলেন, গত ১ সেপ্টেম্বর মাইনুল ইসলাম ওরফে মুসা ওই বাড়ি ভাড়া নেন। মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের মেয়ের মুখ থেকে তাঁরা প্রথম মুসার নাম শোনেন এবং তখন থেকেই তাঁকে খুঁজতে শুরু করেন। আশকোনায় মুসা আছেন—এই তথ্য পেলেও পুলিশ এক এক করে চতুর্থ বাড়িতে গিয়ে আস্তানাটি শনাক্ত করে। অভিযানের শুরুতেই অংশ নেন পুলিশের ১০০ সদস্য।
মেজর (অব.) জাহিদুল ২ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রূপনগরে পুলিশি অভিযানে নিহত হন। মুসাও ওই সময়ে মিরপুরেই থাকতেন।
এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, মেজর (অব.) জাহিদুলের স্ত্রী জেবুন্নাহার পুরোপুরি জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ। জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে জড়ানোর সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল কি না, জিজ্ঞাসাবাদে এমন প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর তিনি দেননি। কখনো কখনো তাঁকে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হয়েছে। তবে তৃষা মনি বাধ্য হয়ে এ পথে এসেছেন বলে জানান।
আশকোনার জঙ্গি আস্তানার ১৯টি তাজা গ্রেনেড সম্পর্কে জানতে চাইলে মনিরুল বলেন, এসব গ্রেনেড ছিল হাতে তৈরি। এর মধ্যে সুইসাইডাল ভেস্টে থাকা গ্রেনেডগুলো ছিল বেশি শক্তিশালী। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সুইসাইডাল ভেস্ট ছিল জঙ্গিদের নতুন প্রযুক্তি। আত্মঘাতী নারী যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন, তার মধ্যে কিছু ফুটেছে, কিছু ফোটেনি। বিস্ফোরণে তাঁর নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গেছে।
শনিবার আশকোনায় অভিযানের পর মনিরুল সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, আত্মঘাতী নারী যখন বিস্ফোরণ ঘটাতে যাচ্ছিলেন, তখন পুলিশ তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিল। কিন্তু ময়নাতদন্তে গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বলা হয়েছে, বোমার আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তে গুলির চিহ্ন না পাওয়া নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, গুলি হয়তোবা ওই নারীর শরীরে ঢুকে বের হয়ে গিয়েছিল।
আরও পাঁচ জঙ্গি গ্রেপ্তার: সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম বলেন, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে মিরপুরের দারুস সালাম এলাকা থেকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। থার্টি ফার্স্ট নাইটে হামলার উদ্দেশ্যে তারা সংগঠিত হচ্ছিল।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন মো. রিয়াজ ওরফে ইঞ্জিনিয়ার ওরফে রাকিব, মো. আবু বিন সাঈম ওরফে বাপ্পী ওরফে অপু, কাজী আবদুল্লাহ আল ওসমান ওরফে আহসান, মো. সোহাগ ওরফে চেয়ারম্যান ও মো. মামুন ওরফে হিমেল। তবে সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের ঠিকানা বা পূর্ণাঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সরবরাহ করা লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা বলেছেন যে তাঁরা রাজশাহী এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত জিয়া, হায়দার, শহীদুল্লাহর নির্দেশ ও পরামর্শ মোতাবেক থার্টি ফাস্ট নাইটে ঢাকায় নাশকতার লক্ষ্য নিয়ে বিস্ফোরকদ্রব্য সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের তরল ও পাউডারজাতীয় ৩০ কেজি বিস্ফোরক পদার্থ, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও বই উদ্ধার করা হয়েছে।
মনিরুল বলেন, পুরোনো জেএমবির এই সদস্যরা ডাকাতি ও ছিনতাই করে জীবিকা নির্বাহ ও সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। এ রকমই কিছু করার জন্য তাঁরা ঢাকায় এসেছিলেন। এই গ্রুপের প্রধান রিয়াজ। রিয়াজ কিছুদিন আগে ভারতে গিয়েছিলেন। সেখানে আরেক জঙ্গি নেতা সালেহউদ্দিন সালেহিনের সঙ্গে দেখা করে তাঁর কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে দেশে ফেরেন। গত অক্টোবরে জেএমবির যে গ্রুপটিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাদের তথ্যমতে এই গ্রুপটিকে গ্রেপ্তার করা হয়।