কাশিমপুর কারাগারে নানা অনিয়ম

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎকোচ, অনিয়ম, অনৈতিক কার্যক্রম ও কারাবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে কাশিমপুর কারাগারে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে ছয়টি গুরুতর অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব অনিয়মের মধ্যে আছে উৎকোচের বিনিময়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের প্রিজন ভ্যানের বদলে বেসরকারি বিলাসবহুল মাইক্রোবাসে করে আনা-নেওয়া, আসামির স্বজনদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়া, যাচাই-বাছাই না করে দুর্ধর্ষ আসামিদের সঙ্গে স্বজনদের দেখা করিয়ে দেওয়া, বন্দীদের নির্যাতন এবং নির্যাতনের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করে তা স্বজনদের দেখিয়ে অর্থ আদায়।

>সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে কাশিমপুর কারাগারে ছয়টি গুরুতর অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, কারাগারের অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকেই বদলি করা হয়েছে। অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিবেদনে আরও যেসব অভিযোগ উঠে এসেছে তা তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি। এ ছাড়া অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’
গাজীপুর জেলার কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে মোট ৫ হাজার ৮২১ জন বন্দী আছেন। এর মধ্যে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম, ফ্রিডম সোহেল, হরকাতুল জিহাদ, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা ও জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত আসামিসহ বিভিন্ন দেশের বন্দীরা রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ আসামিদের আদালতে হাজির করার জন্য প্রিজন ভ্যান বাদ দিয়ে ভাড়া করা মাইক্রোবাস ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কারাগার সূত্র জানায়, কারাবিধি অনুযায়ী আদালতের নির্দেশ ছাড়া যেকোনো পরিস্থিতিতে আসামি স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে প্রিজন ভ্যান ব্যবহার করতে হবে। তবে কারাগারের একজন ডেপুটি জেলার প্রথম আলোকে বলেন, জেলকোড অনেক পুরোনো, সেখানে বলা ছিল আসামিকে ট্রেনে আনা-নেওয়ার কথা। এখন নিরাপত্তার প্রয়োজনে আমরা প্রিজন ভ্যান ব্যবহার করছি। তবে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কোনো নির্দেশনা নেই। তবে কিছু কিছু বন্দীর ক্ষেত্রে আসামিকে আরামদায়ক যানবাহন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন বলেন, ‘৩২ জন খুনের আসামি কারাগারে অনৈতিক কার্যক্রম করতে পারছে না বলে এসব গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করিয়েছে।
আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা নেই, তাই আমরা এভাবে পুলিশের গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন তৈরি করতে পারি না।’ তিনি বলেন, ‘সাকা চৌধুরী বা আশরাফি পাপিয়ার সঙ্গে যদি কেউ দেড় ঘণ্টা দেখা করেন তাহলে ওখানকার জেল সুপাররা বসে কী করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ যখন আসামিদের আদালতে নিয়ে যাচ্ছে তখন তারাই মুঠোফোন ব্যবহার করার সুযোগ করে দিচ্ছে। টপটেরররা পুলিশের গাড়িতে বসে কথা বলেছে, এমন প্রমাণ অনেক আছে। আসলে আমাদের দিয়ে কারাগার চলছে না, এমন অবস্থা তৈরি করে পুলিশ কারাগারের ভেতরে এসে দায়িত্ব নিতে চাইছে।’
আইজি প্রিজন বলেন, ‘এত কম জনবল দিয়ে পুরো কারাগারের দেখভাল করা অনেক কষ্টকর। আমরা ৮৪ সালের জনবল দিয়ে চলছি। আমাদের জনবল রয়েছে ৭ হাজার আর আসামি ৭৫ হাজার ৭৫০। এভাবে চলতে পারে না।’
মুঠোফোনে কথা বলার সুযোগ: কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে হাজিরার জন্য প্রিজন ভ্যান বা অন্যান্য বাহনে করে আসামিদের আনা-নেওয়া হয়ে থাকে। প্রিজন ভ্যানে ওঠার আগে ও গন্তব্যে নামার পর আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়া পর্যন্ত আসামিদের বেশ কিছু সময়ের জন্য সংশ্লিষ্ট গারদখানায় অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষা করার সময় কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় আসামিরা তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে দেখা বা মুঠোফোনে কথা বলার সুযোগ পান। কাশিমপুর কারাগার সূত্র জানায়, আসামি কারাগার থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর সব দায় দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশ আসামি বুঝে নিলেই নিরাপত্তার দায়িত্ব তাদের।
অতিরিক্ত লোকের সাক্ষাৎ: জেলকোড অনুযায়ী প্রতিবার একজন আসামির সঙ্গে পাঁচজনের বেশি লোকের দেখা করা যায় না। কিন্তু কারা কর্মকর্তারা স্বজনদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে একসঙ্গে ১৫ জন লোকেরও সাক্ষাতের সুযোগ করে দেন। সাক্ষাৎপ্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলে অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৪ আগস্ট কাশিমপুর কারাগারে তারেক রহমানের এপিএস মিয়া নুরুদ্দিন অপুর সঙ্গে তাঁর আত্মীয়স্বজনের নাম লিখিয়ে ১০-১২ জন, সালাউদ্দিন কাদেরের (সাকা চৌধুরী) আইনজীবী ফখরুল ইসলামের সঙ্গে ১০-১১ জন, ১০ জুলাই কাশিমপুর পার্ট-১ কারাগারে সাকা চৌধুরীর সঙ্গে ১০ জন, ১১ জুলাই বিএনপির সাবেক সাংসদ সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়ার সঙ্গে সাতজন প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় ডেপুটি জেলার শাহ শরীফ ও সাখাওয়াত, মহিলা কারাগারের ডেপুটি জেলার লিপি রানী সাহা এবং পার্ট-১ কারাগারের ডেপুটি জেলার মো. মমিন মিয়া দায়িত্বে ছিলেন। মূলত জেলারের নির্দেশেই ডেপুটি জেলাররা এ ধরনের অনিয়ম করেন।
সম্প্রতি শীর্ষ সন্ত্রাসী আব্বাস ওরফে কিলার আব্বাস ভিআইপি কক্ষে বসে স্বজনদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ সাক্ষাতের সুযোগ নেন।
এ বিষয়ে হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার-৪ এর ডেপুটি জেলার শাহ শরীফ বলেন, ডেপুটি জেলাররা কখনোই নিজের উদ্যোগে কিছু করতে পারেন না। সব জেলারের নির্দেশেই হয়। সাধারণ ও ভিআইপি কয়েদিদের সঙ্গে সাক্ষাতের নিয়ম জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেড় ঘণ্টা সাক্ষাতের কোনো নিয়ম নেই। জেলকোড অনুযায়ী ৩০ মিনিট সাক্ষাৎ করতে পারেন। তবে আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হয়। মহিলা কারাগারের ডেপুটি জেলার লিপি রানীও বলেন, জেলারের অনুমতি ছাড়া তাঁরা কিছুই করতে পারেন না।
বন্দী নির্যাতন: কাশিমপুর কারাগারে জেলার ও জেলারের অনুগত ব্যক্তিরা আসামি ও বন্দীদের সামান্য কটুকথা বা অন্যায় বা ত্রুটির জন্য শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। নির্যাতনের পর জখমের চিহ্ন মুঠোফোনে ধারণ করে আসামিদের স্বজনকে দেখিয়ে আরও নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২০ জুন কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের জেলার জান্নাতুল ফরহাদ আসামি ফয়েজ আহমেদকে ইফতার বেশি চাওয়ার অপরাধে পিটিয়ে জখম করেন। ঘটনাটি জানাজানি হলে আদালত রুল ইস্যু করে, যা বিভিন্ন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
সরেজমিন: আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, কাশিমপুর কারাগার এলাকায় ২০ অক্টোবর ছয় ঘণ্টা অবস্থান করে দেখা যায়, দর্শনার্থীদের শরীর ও সঙ্গে থাকা ব্যাগ তল্লাশি করা হচ্ছে। দুই কারারক্ষী বন্দীদের সঙ্গে দেখা করতে স্বজনদের টোকেন দিচ্ছেন। টোকেন দেখালেই তাঁরা সাক্ষাৎ পাচ্ছেন, কিন্তু সীমিত সময়ের জন্য। তবে পয়সা দিলেই বেড়ে যায় সময়। গাজীপুরের সালনা এলাকার এক ব্যবসায়ী বন্দী আছেন পার্ট-২ এ। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন স্ত্রী, সঙ্গে শ্বশুর। তাঁরা বলেন, টোকেন করতে কোনো টাকা লাগে না। কিন্তু ভেতরে গিয়ে একটু আরাম করে কথা বলতে চাইলে ১০০ টাকা লাগে। তবে তাঁরা সেদিন দিয়েছেন ৬০০ টাকা। এর জন্য দীর্ঘ সময় আলাদা কক্ষে বসে কথা বলেছেন। কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দী ঢাকার বাড্ডা এলাকার এক ব্যক্তি মুঠোফোনে মাকে দেখা করতে বলেন। তাই মা ছুটে এসেছেন কারাগারে। ছেলের সঙ্গে দেখা করার সময় অনেক পরে। তাই ক্যানটিনের সামনে বসে ছিলেন। তিনি নিজেই ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার বিষয়টি বলেন। কীভাবে ফোন করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এইটা কোনো সমস্যা না, ওইখানকার পুলিশরাই ফোন ধরাইয়া দিছে।
সম্প্রতি কাশিমপুরের জেলার ফরিদুর রহমানকে বদলি করা হয়েছে।