ঘুরে দাঁড়ানোর দুই বছর

সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গি আস্তানায় সেনা কমান্ডোদের অভিযান।  ফাইল ছবি
সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গি আস্তানায় সেনা কমান্ডোদের অভিযান। ফাইল ছবি
>
  • অভিযানে মোট নিহত ৮৮ জন
  • গ্রেপ্তার ৭৪১ জন
  • বড় ঘটনা ঘটানোর ক্ষমতা জঙ্গিদের নেই

দেশে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল—এমন ৮১ জন গত দুই বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ৭৪১ জন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে বড় ধরনের নৃশংসতা চালানোর মতো শক্তি-সামর্থ্য এখন আর জঙ্গিদের নেই।

২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস জঙ্গি হামলার পর দেশে নতুন করে জঙ্গি উত্থানের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা এখন আর নেই বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।

হোলি আর্টিজানে হামলার পর গত দুই বছরে পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি) এবং র‍্যাবের অভিযানে ৭১ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি অভিযানে ৭টি শিশু মারা যায়। পুলিশ ও র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় আরও ১১ জন। এ নিয়ে মোট নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৮৮। এই সময়ে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে ৭৪১ জন। এর মধ্যে র‍্যাব ৪৭১ জনকে ও সিটিটিসি ২৭০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

২০১৫ সাল থেকে সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগত সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হয় জঙ্গিরা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের হত্যার শিকার হন পুরোহিত, সাধু, মাজারের খাদেম, খ্রিষ্টান যাজক, বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা, শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মঠপ্রধান, তরিকতপন্থী নেতা, ধর্মান্তরিত ব্যক্তি, পীরের অনুসারী ও দরজি। তখন নিয়মিত বিরতিতে ঘটনাগুলো ঘটলেও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংস্থাগুলোর উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা ছিল না। হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর নড়েচড়ে বসে সবাই।

জঙ্গিদের ওই নৃশংস হামলার কারণ হিসেবে সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, হোলি আর্টিজানে হামলার দুই মাস আগে ঢাকার কলাবাগানে সমকামী অধিকার-বিষয়ক পত্রিকা রূপবান-এর সম্পাদক জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয়কে হত্যা করে আনসার আল ইসলামের জঙ্গিরা। এ ঘটনাটি দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে বড় পরিসরে আসে। ওই ঘটনার দুই দিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক রেজাউল করিমকে হত্যা করেছিল নব্য জেএমবি। কিন্তু সেটা কলাবাগানের ঘটনার মতো গণমাধ্যমে প্রচার পায়নি। এরপর ঢাকায় বিদেশিদের আনাগোনা আছে—এমন একটি জায়গায় হামলার পরিকল্পনা করে।

হোলি আর্টিজানের এই হামলার ছয় দিন পর কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় পুলিশের ওপর হামলা করে জঙ্গিরা। তাদের হামলায় দুই পুলিশ সদস্য নিহত হন। গুলিবিনিময়কালে একজন সাধারণ নারী এবং একজন জঙ্গি নিহত হয়।

এরপর জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ১৯ দিনের মাথায় কল্যাণপুরের একটি জঙ্গি আস্তানায় সিটিটিসির অভিযানে নিহত হয় নয়জন জঙ্গি। এরপর থেকে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখে পুলিশ ও র‍্যাব।

২০১৭ সালের ১৭ মার্চ ঢাকার আশকোনায় র‍্যাবের ব্যারাকে আত্মঘাতী হামলা চালায় এক জঙ্গি। এর আট দিন পর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গোলচত্বরে পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে লাগেজ বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় আরেক জঙ্গি। এরপর জঙ্গি হামলার কোনো ঘটনা না ঘটলেও অব্যাহত ছিল পুলিশের অভিযান। প্রায় এক বছর পর এই বছরের ৩ মার্চ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা করে এক জঙ্গি। গত ১১ জুন সন্ধ্যায় মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুকে গুলি করে হত্যার পর আলোচনায় আসে জঙ্গিরা।

তবে গতকাল সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা মোটামুটি আত্মবিশ্বাসী বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটানোর ক্ষমতা জঙ্গিদের নেই। তবে এটি নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, জঙ্গিদের মতবাদ যত দিন পর্যন্ত সর্বসম্মতিক্রমে ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত না হবে, যত দিন পর্যন্ত একজন লোক এই আদর্শে বিশ্বাস করবে, তত দিন পর্যন্ত কমবেশি ঝুঁকি থাকবে।