ডিভির আদলে লটারির প্রলোভন

ইউএসএ ট্যুর ফেয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত ইউএসএ লটারির বিজ্ঞাপন প্রচার করছে
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

‘ডিভি লটারির মতোই ইউএসএ লটারির ফরমটি সঠিকভাবে পূরণ করে জমা দিন। আবেদন সম্পূর্ণ করে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করুন।’—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন দিয়ে লোকজনকে প্রলুব্ধ করছে ‘ইউএসএ ট্যুর ফেয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস বলছে, ইউএসএ লটারি নামের কোনো প্রোগ্রাম যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নেই। তাই এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনের সঙ্গেও সম্পৃক্ততা নেই মার্কিন সরকারের।

বিজ্ঞাপনটি বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুক ও ইউটিউবে ঘুরছে। বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে, ২৫ ডলার বা ২ হাজার ১০০ টাকা দিয়ে ইউএসএ লটারিতে অংশ নেওয়া যাবে। ৩০ এপ্রিল রাত ১০টায় ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে লটারি বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। লটারি বিজয়ীরা কোম্পানির খরচে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবেন।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) প্রোগ্রাম রয়েছে। ডিভি লটারিতে অংশ নিতে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় না। কারও কাছ থেকে অর্থও নেওয়া হয় না। কিন্তু ডিভি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের নাগরিকেরা এখন আর যোগ্য নন। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দিয়ে থাকে মার্কিন সরকার। বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান এ ভিসার নিশ্চয়তা কোনোভাবেই দিতে পারে না।

বিজ্ঞাপনটি বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুক ও ইউটিউবে ঘুরছে
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস আগে একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে লটারি-সংক্রান্ত কোনো ধরনের প্রোগ্রামে অংশ না নিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছে।

ইউএসএ ট্যুর ফেয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওসহ যেসব বিজ্ঞাপন প্রচার করছে, তা অনেক মানুষ দেখছে, মন্তব্য করছে, শেয়ার করছে।

লটারির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের পাশাপাশি আবেদনের জন্য কোম্পানির নিজস্ব অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হচ্ছে। অ্যাপটি অস্বাভাবিক হারে ডাউনলোড হতে দেখা গেছে।

১৭ মার্চ পর্যন্ত অ্যাপটি ডাউনলোড হয় ২০ হাজার ৩২৫ বার। ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ডাউনলোড হয় ১ লাখের বেশি বার। ১২ এপ্রিল পর্যন্ত ডাউনলোড ২ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

ইউএসএ ট্যুর ফেয়ার বলছে, ডিভির আদলে তারা নিজ উদ্যোগে ইউএসএ লটারি ২০২২ প্রোগ্রাম চালু করেছে। আবেদনকারীকে বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম এসএসসি বা দাখিল পাস। বয়স ১৮ থেকে ৫০ বছর। নির্ধারিত ২০ হাজার আবেদন পরিপূর্ণ হয়ে গেলে আবেদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। লটারিতে বিজয়ী ১০ জন কোম্পানির খরচে আমেরিকায় স্থায়ী বসবাস করতে পারবেন। বাকি ৯০ জন মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় ৬ দিনের ট্যুর করতে পারবেন। লটারিতে অংশগ্রহণকারীরা আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও শেনজেন ভিসার জন্য কোম্পানির ভিসা প্যাকেজ নিলে লটারি ফি (২ হাজার ১০০ টাকা) ফেরত দেওয়া হবে।

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ইউএসএ ট্যুর ফেয়ারের বিজ্ঞাপনে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও লটারিতে অংশ নিতে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। এতে বলা হয়, প্রবাসীদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও চলবে।

ফেসবুকে ইউএসএ ট্যুর ফেয়ারের বিজ্ঞাপনের পোস্টের মন্তব্যের ঘরে দেখা গেছে, লোকজন জানতে চাইছেন, কীভাবে আবেদন করতে হবে। তবে কেউ কেউ কথিত এই ইউএসএ লটারিকে প্রতারণা বলে অভিহিত করেছেন।

খান গাফফার মোহাম্মদ নামের একজন লিখেছেন, ‘আপনারা তো প্রতারক। রোজার মধ্যে ধান্দাবাজি শুরু করেছেন।’

ইউটিউবের ভিডিও লিংকে রোহান খান নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘ভাইরে ভাই, কী একটা স্ক্যাম (জালিয়াতি)। ২০ হাজার জনের লটারি। একেক জনের ২ হাজার ১০০ টাকা। ২০ হাজার জন গুণ ২ হাজার ১০০ টাকা করে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। যদি ভুয়া হয়, এক দিনে ওরা বড়লোক। আর যদি সত্যিও হয়, একজন যদি জিতেও যায়, এক লাখ মার্কিন ডলার ব্যাংকে দেখিয়ে বিজনেস ভিসা নিয়ে দেবে, বাকি টাকা পুরা গায়েব, হোয়াট আ স্ক্যাম ম্যান...।’

ইউএসএ ট্যুর ফেয়ার
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

বিজ্ঞাপনটি সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউএসএ ট্যুর ফেয়ারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইউএসএ লটারি প্রোগ্রামটি কোম্পানির উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে। এ প্রোগ্রামের সব দায়দায়িত্ব কোম্পানির।

ইউএসএ ট্যুর ফেয়ারের অন্যতম অংশীদার আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘লটারি বিজয়ী ১০ জনকে কোম্পানির খরচে আমেরিকায় স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়া হবে। লটারি বিজয়ীদের স্টুডেন্ট ভিসা, টুরিস্ট ভিসা ও জব ভিসা ইবি-থ্রির মাধ্যমে অদক্ষ ক্যাটাগরিতে ভিসা প্রসেস করা হবে। জব ভিসা ইবি-থ্রির ক্ষেত্রে বিজয়ী ব্যক্তিরা বিনা খরচে পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারবেন।’

বিজ্ঞাপনটির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি যা বলছে, তাতে সত্যতা না থাকলে, প্রতারণার বিষয় থাকলে, যে কেউ আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে পুলিশ সহযোগিতা করবে।’