পুরোনো জেএমবি নতুন শঙ্কা
>
- নির্বাচনের ডামাডোলে মাথাচাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি
- সক্রিয় হচ্ছে আনসারুল্লাহও।
- নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যার লক্ষ্যবস্তু করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা।

নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যার লক্ষ্যবস্তু করে নিজেদের জানান দিতে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে পুরোনো জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমন কিছু ব্যক্তির নাম বা তালিকা পেয়ে এরই মধ্যে তাদের সতর্ক করেছে বলে জানা গেছে।
পুরোনো জেএমবি নতুন করে শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে। সংগঠনটি নতুন নেতৃত্বে এখন দেশের ভেতরে সংগঠিত হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্প্রতি কিছু তথ্য ও আলামত পেয়েছে। পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, গত ঈদের আগে জেএমবি দেশে নাশকতার পরিকল্পনা করছিল। সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে পুলিশ। দেশের বাইরে পলাতক জেএমবির কয়েকজন নেতা সংগঠনের সদস্যদের চাঙা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে তহবিল জোগাড়ের জন্য অতীতের মতো ডাকাতি শুরু করেছে এই জঙ্গিগোষ্ঠী। এমনই এক ডাকাতির ঘটনার সূত্র ধরে গাজীপুর থেকে মুন্সিগঞ্জের প্রকাশক ও লেখক শাহজাহান বাচ্চু হত্যায় জড়িত জঙ্গি আবদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পরে আবদুর রহমান পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।
পুলিশ সূত্র জানায়, এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জেএমবির ২০-৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা ডাকাতিতে যুক্ত। এর মধ্যে তারা বেশ কয়েকটি ডাকাতি করেছে। সর্বশেষ গত ২৯ মার্চ ঢাকার দক্ষিণখানে ডাকাতি করতে গিয়ে জেএমবির পাঁচ জঙ্গি ধরা পড়েছে।
আল-কায়েদার মতাদর্শ অনুসারী আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলামও আবার সক্রিয় হওয়ার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত একটি সূত্র জানায়, গত ১১ জুন মুন্সিগঞ্জে বাচ্চু হত্যায় পুরোনো জেএমবি জড়িত থাকলেও তিনি আনসার আল ইসলামেরও লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। আনসার আল ইসলাম বাচ্চুর ওপর নজরদারিও করেছিল।
তাই বাচ্চু হত্যা দুই সংগঠনের যৌথ ঘটনাও হতে পারে, এমন ধারণার কথাও বলছেন বিশ্লেষকেরা। দুই জঙ্গিগোষ্ঠীরই হামলার লক্ষ্যবস্তুর পৃথক তালিকা রয়েছে। এতে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ ভিবিন্ন এলাকার ভিন্ন মতাবলম্বী ব্যক্তি এবং মাজার-খানকা কেন্দ্রীক ব্যক্তির নাম রয়েছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে উভয় জঙ্গিগোষ্ঠীর অভিন্ন লক্ষ্যবস্তুও আছে। এমন লক্ষ্যবস্তুতে তারা যৌথভাবে হামলা করতে পারে, এমন আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।
জেএমবি নিয়ে কেন শঙ্কা
১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া এবং ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০ বোমা ফাটিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবি। ২০১৬ সালের পর থেকে এই সংগঠনটি তেমন কোনো ঘটনা ঘটাতে পারেনি। যদিও গত কয়েক বছরে বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি হত্যার ঘটনায় জেএমবিকে সন্দেহ করা হয়।
এদিকে দেশে সুবিধা করতে না পেরে জেএমবির একটা অংশ বেশ কয়েক বছর ধরে ভারতে আশ্রয় নেয় এবং সেখানে সাংগঠনিক বিস্তার ঘটায়। জেএমবি ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে ও পুলিশ হত্যা করে তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতা সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহিন, জাহিদুল ইসলাম ওরেফ বোমা মিজানসহ তিনজনকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সালাহউদ্দিন ও বোমা মিজান এরপর থেকে ভারতে আছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানতে পেরেছে, ভারতে জেএমবি দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। একটা অংশের নেতৃত্বে সালাহউদ্দিন। অপর অংশের নেতৃত্বে আছে বোমা মিজান। বোমা মিজানের অংশ সেখানে জেএমআই বা জামাআতুল মুজাহিদীন ইন্ডিয়া নাম ধারণ করেছে। তারা গত জানুয়ারিতে ভারতের বুদ্ধগয়ায় তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাইলামাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। গত ৩১ জানুয়ারি গ্রেপ্তার হওয়া দুই জেএমবির সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই তথ্য পায় কলকাতা পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স। যা পরে ভারতের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সম্প্রতি তথ্য পেয়েছেন যে, দেশের ভেতরে জেএমবির একটা অংশ নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এর নেতৃত্বে রয়েছে আধুনিক শিক্ষিত নতুন এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে আরও চার-পাঁচজন যুক্ত হয়েছে। এরপর জেএমবি মুন্সিগঞ্জে বাচ্চুকে হত্যা করে।
এর আগে নাস্তিক বা ভিন্ন মতাবলম্বী লেখালেখির জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিকে হত্যায় যুক্ত ছিল আনসার আল ইসলাম। এখন জেএমবিও এ ধরনের হত্যায় যুক্ত হওয়ায় শঙ্কা বেড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, সীমান্তের এপার-ওপার থেকে অস্ত্র-বিস্ফোরক সংগ্রহের চোরাইপথগুলো জেএমবির জানা আছে। তাদের কাছে বোমা তৈরির কারিগরও আছে। আগে থেকেই অন্য জঙ্গিগোষ্ঠীর তুলনায় জেএমবির সদস্য ছিল বেশি। তাদের অনেক সদস্য দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয়। কিন্তু তাঁরা সংগঠনকে আগের মতো ১০-২০ টাকা করে বা সামর্থ্য অনুযায়ী চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। এখন এসব পুরোনো সদস্যকে সক্রিয় করে জেএমবি আবার সংগঠিত হতে পারলে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে তারা।
অবশ্য ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম গত শনিবার গণমাধ্যমকে বলেছেন, জঙ্গিদের পক্ষে বড় ধরনের কিছু করার সামর্থ্য নেই এখন। এ ব্যাপারে তাঁরা আস্থাশীল।
ভোটের আগে মাথাচাড়া দিতে পারে
জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, কারাগারে জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আছেন। সেখানে উভয় সংগঠনের মধ্যে একটা যোগাযোগ, সমন্বয় গড়ে উঠেছে। জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলের সময় এই দুই সংগঠন আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠতে পারে। এর আগে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনেও জেএমবি একই চেষ্টা করেছিল। তখন কুমিল্লার চান্দিনায় এক নির্বাচনী জনসভায় বোমা হামলা করতে গিয়ে জনতার হাতে কয়েকজন জঙ্গি ধরা পড়ায় তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। ২০১৪ সালেও জেএমবি ভারতে বসে নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওই বছর ভারতের বর্ধমানের খাগড়াগড়ে জেএমবির এক আস্তানায় বোমা বিস্ফোরণের পর বিষয়টি জানাজানি হয়।
বগুড়া পুলিশের একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি সেখানকার এক জঙ্গি আস্তানা থেকে জেএমবির নাশকতার পরিকল্পনার চিঠি পায় পুলিশ। তাতে এক জঙ্গি লিখেছে, ‘সামনে নির্বাচন। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। অস্ত্র-বিস্ফোরক সংগ্রহে তৎপর হওয়া দরকার।’
এ কারণে আগামী ডিসেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখে আবার জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয় কি না, সেই দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
আনসার আল ইসলাম
২০০৮ সালে জন্ম নেওয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলাম ২০১৩ সাল থেকে ব্লগার হত্যার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে। তাদের সর্বশেষ হত্যাযজ্ঞ ছিল ২০১৬ সালের এপ্রিলে রাজধানীর কলাবাগানে সমকামী অধিকারকর্মী ও মার্কিন দূতাবাসের কর্মী জুলহাজ মান্নান এবং তাঁর বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব তনয় হত্যা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আনসার আল ইসলাম অনেকটা ঘাপটি মেরে আছে। তবে হামলার লক্ষ্যবস্তু থেকে সরে আসেনি। এর সামরিক প্রধান চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ জিয়াউল হক। তাঁকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অবশ্য এই সংগঠনটির বিষয়ে নজরদারি করেন, এমন একজন কর্মকর্তার মতে, এখন আনসার আল ইসলামের সক্রিয় সদস্য ৪০ থেকে ৫০ জনের মতো হতে পারে। এঁরা জেএমিবর সঙ্গে যৌথভাবে নাশকতায় নামেন কি না, সেটাও দুশ্চিন্তার কারণ। তবে সিটিটিসির উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, এখন আনসার আল ইসলামের অনলাইনকেন্দ্রিক কিছু প্রচারণা আছে। তারা নতুন করে সদস্য সংগ্রহ করতে না পারলে সুবিধা করতে পারবে না।
নব্য জেএমবি
সিটিটিসির কর্মকর্তাদের মতে, নব্য জেএমবির বেশির ভাগ নেতা ও সদস্য তাঁদের বিভিন্ন হামলা বা র্যাব-পুলিশের অভিযানে নিহত হয়েছেন। এখন তাঁদের পক্ষে সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থা নেই।
তবে সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, সংগঠনটির অল্প কিছু সদস্য এখনো কথিত হিজরতের নামে ঘরছাড়া। এ সংখ্যা ৮ থেকে ১০ জন হতে পারে। এখন আইএস মতাদর্শী এই জঙ্গিগোষ্ঠী আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, সেটা নির্ভর করছে জঙ্গিবাদের বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর। বিশেষ করে যেসব বাংলাদেশি আইএসে উদ্বুদ্ধ হয়ে সিরিয়া বা আফগানিস্তানে গেছেন, তাঁরা দেশে নতুন করে কার্যক্রম বিস্তারের চেষ্টা করেন কি না, এটা গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মতে, কারাগার খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান। নব্য জেএমবির কিছু সদস্য পারিবারিকভাবে ধনী। কারাগারে তাঁদের সঙ্গে পুরোনো জেএমবির যোগাযোগ গড়ে উঠলে এবং টাকাপয়সা পেলে বিপজ্জনক হয়ে উঠবেন এঁরা। জঙ্গিদের কাছে টাকা স্ফুলিঙ্গের মতো।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে স্তিমিত আছে। এটার অর্থ এই নয় যে, তাদের কোনো সক্ষমতা নাই। দেখার বিষয় নির্বাচনপূর্ব কী ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশে বিরাজ করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক শূন্যতা অথবা রাজনৈতিক সংঘাত যদি হয় তাহলে এসব জঙ্গিগোষ্ঠী নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ খুঁজবে। তারা সব সময় এ ধরনের পরিস্থিতি ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।