পুলিশের সহায়তায় তরুণী অপহরণ!

মাদারীপুরে অপহরণ মামলায় জবানবন্দি দিতে এসে আদালত চত্বর থেকে আবারও অপহরণের শিকার হয়েছেন এক তরুণী। আর এ অপহরণে একজন পুলিশ কর্মকর্তা সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার বিকেলে মাদারীপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত চত্বরে এ ঘটনা ঘটে।
ওই তরুণীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার চন্দিদাসদী এলাকার মজিবুর রহমানের ছেলে হাবিবুর রহমান ওরফে আবিদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ওই তরুণীর। একপর্যায়ে পরিবারের চাপে হাবিবুরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন তরুণী। পরে গত ২৫ নভেম্বর কলেজে যাওয়ার পথে ওই তরুণীকে অপহরণ করা হয়। ঘটনার পর রাজৈর থানায় হাবিবুর ও তাঁর পরিবারের সদস্যসহ অজ্ঞাত কয়েকজনের নামে একটি অপহরণ মামলা হয়। এ মামলায় মঙ্গলবার আদালতে জবানবন্দি দিতে আসেন তরুণী। জবানবন্দি দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে আবারও তাঁকে অপহরণ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী আদালতের একাধিক সূত্র জানায়, সকাল নয়টা থেকে চরমুগরিয়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক শাহাদাৎ হোসেন তাঁর ফাঁড়ির কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান নেন। পরে বিকেলে বের হওয়ার সময় আদালত চত্বর থেকে কয়েকজন একটি মাইক্রোবাসে জোর করে তুলে নেয় ওই তরুণীকে। এ সময় তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাধা দিলে পুলিশ ওই তরুণীর মা ও কাকাকে মারধর করেন। পুলিশ কর্মকর্তা শাহাদাৎ হোসেন ও আসামি হাবিবুর রহমানের বাড়ি একই এলাকায় হওয়ায় তিনি অপহরণে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ তরুণীর পরিবারের।
তরুণীর মা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মেয়েকে ওরা জোর করে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে মামলা করায় চাপে পড়ে ওরা আদালতে হাজির হয়। এ সময় আমরা আমাদের মেয়েকে নিয়ে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। তারা আমাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় আমি বিচার চাই। আমার মেয়েকে ফেরত চাই।’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজৈর থানার উপপরিদর্শক খান মো. জোবায়ের বলেন, ‘তরুণীকে অপহরণের মামলায় ওই ছেলের মা ও মামাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় ওই তরুণী জবানবন্দি দেন। আদালত তাঁর জবানবন্দি শুনে নিজ জিম্মায় ছেড়ে দেন। পরে কী হয়েছে আমার জানা নেই।’
আদালতে দায়িত্বে থাকা পুলিশের পরিদর্শক রমেশ চন্দ্র দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘অপহরণসংক্রান্ত এক মামলায় ওই তরুণী আদালতের কাছে জবানবন্দি দেন। এ সময় তাঁকে নিজ জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁর সঙ্গে আদালতে উভয় পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় সদর থানা-পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা কী করেছে তা আমার জানা নেই। তবে চরমুগরিয়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক শাহাদাৎ হোসেন ও তাঁর সঙ্গীয় ফোর্সকে আদালত চত্বরে সকাল থেকেই দেখা গেছে।’
আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করে চরমুগরিয়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘আমাকে সদর থানার ওসি ফোন করে আদালতে আসতে বলেন। তাই এখানে আসি। এসে জানতে পারি, এক তরুণী আদালতে জবানবন্দি শেষে নিজ জিম্মায় বাসায় যেতে ভয় পাচ্ছেন। তখন তাঁকে পুলিশের সহযোগিতায় মস্তফাপুর পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া হয়।’
ওই তরুণীর বাড়ি মস্তফাপুর থেকে আরও ১৮ কিলোমিটার দূরে রাজৈরে। তাহলে তাঁকে মাঝপথে মস্তফাপুর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হলো কেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘বাসায় ফিরতে ভয় পাচ্ছিলেন। তাই তাঁকে কিছু পথ এগিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি কীভাবে যাবেন সেটা তাঁর ব্যাপার। তবে আমার সামনে তাঁকে কেউ জোর করে তুলে নিতে আসেনি।’
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মঙ্গলবার একটি সংঘর্ষের ঘটনায় আমাদের সদরে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা অন্য জায়গায় অবস্থান নেয়। দুপুরের দিকে জানতে পারি, আদালত প্রাঙ্গণে ঝামেলা সৃষ্টি হতে পারে। তাই চরমুগরিয়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শককে সেখানে যেতে বলা হয়। তবে কাউকে কোথাও পৌঁছে দিতে বলা হয়নি।’
সদর থানার বাইরে থেকেও ফাঁড়ির পরিদর্শক শাহাদাৎ হোসেন কীভাবে আদালতে দায়িত্ব পালন করেন, জানতে চাইলে মাদারীপুর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন কুমার দেব প্রথম আলোকে বলেন, ফাঁড়ির পরিদর্শক কোনো অবস্থাতেই আদালতে দায়িত্ব পালনে আসতে পারেন না। ওই তরুণীর পরিবার থেকে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করলে পুলিশের ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মূল অপহরণকারী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।