বিউবোর প্রধান প্রকৌশলীসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা

বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে দুর্নীতির অভিযোগে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) দুই কর্মকর্তা ও বগুড়ার একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের বগুড়া জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আল আমীন বাদী হয়ে আজ বুধবার বগুড়া সদর থানায় মামলাটি করেন।
মামলার আসামিরা হলেন বিউবোর মহাব্যবস্থাপক দপ্তরের প্রকল্প পরিচালক (প্রধান প্রকৌশলী) মো. মোস্তাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত পরিচালক এ এইচ এম তসলিম হোসেন ও বগুড়ার কটন স্পিনিং কোম্পানি লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. তৌফিকুর রহমান।
মামলার এজাহারে বলা হয়, বগুড়া কটন স্পিনিং কোম্পানি ১৯৬৮ সালে ৩২ হাজার টাকা জামানত রেখে বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তাদের কোনো বকেয়া বিল ছিল না। পরবর্তী সময় কোম্পানির মালিক অনিয়মিতভাবে বিল পরিশোধ শুরু করেন। বকেয়ার দায়ে ১৯৯১ সালে ওই কোম্পানির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। বিদ্যুৎ আইনমতে, বিলম্বিত মোট বিলের ওপর ২ শতাংশ হারে সারচার্জ (বিলম্ব মাশুল) দিতে হয়। সে অনুযায়ী ২০০২ সালে কোম্পানির বিদ্যুৎ বকেয়া বিল হয় ৫২ লাখ ১৬ হাজার ৪৩৫ টাকা এবং সারচার্জ ২ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার ৭৭৩ টাকা। এই টাকা আদায়ের জন্য ২০০৮ সালে বিদ্যুৎ আদালতে ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
বিলটি সংশোধনের জন্য বিউবোর চেয়ারম্যান বরাবর ২০১১ সালে দুটি আবেদন করেন তৌফিকুর। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিউবো চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি তদন্ত শেষে গ্রাহকের কাছে ১৯৮৫ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৯১ সালের আগস্ট পর্যন্ত ডিমান্ড চার্জ ২ লাখ ৮ হাজার টাকাসহ আসল ২৪ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮৬ টাকা ও সারচার্জ ১ কোটি ২৮ লাখ ৮৬ হাজার ৯১৩ টাকা বকেয়া আদাযোগ্য বলে মত দেয়। ২০১১ সালের এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। কিন্তু বিউবোর অতিরিক্ত পরিচালক এ এইচ এম তসলিম হোসেন সারচার্জের বিষয়টি গোপন রেখে অন্যান্য বিল আদায়ের সিদ্ধান্তে সংশোধিত বিল মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক পরিচালন) ও সদস্যের (বিতরণ) কাছে উপস্থাপন করেন। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রাহক তৌফিকুর বগুড়া বিউবোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে ২২ লাখ ৫৩ হাজার ২৮৬ টাকা ইস্যু করেন ২০১১ সালের নভেম্বরে। এই বিলে কোনো সারচার্জ দেননি তিনি।
কিন্তু বগুড়া বিউবোর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, তদন্ত কমিটির সুপারিশকৃত সারচার্জ আদায় হবে কি না। এর পরিপ্রেক্ষিতে তসলিম হোসেন ব্যাখ্যা দেন, ‘সংশোধিত বিল যেহেতু গ্রাহক নির্ধারিত তারিখের মধ্যে পরিশোধ করেছেন বিধায় এ ক্ষেত্রে সারচার্জ বা সুদের প্রশ্ন থাকে না। গ্রাহকের সংশোধিত বকেয়া আদায়, নিরাপত্তা জামানত সমন্বয় ও সংযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন, বিধায় দেনা-পাওনা নিষ্পন্ন বিবেচনা করা যায়।’ এই ব্যাখ্যার পর বিউবোর মহাব্যবস্থাপক দপ্তরের প্রকল্প পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান এটি মহাব্যবস্থাপকের কাছে দেন। এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত পোষণ করে মহাব্যবস্থাপকের পক্ষে এই ‘ব্যাখ্যাপত্রে’ স্বাক্ষর করেন মোস্তাফিজুর রহমান।
পরে বিদ্যুৎ আদালত বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানালে ২০১৬ সালে বিউবো আবারও চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই তদন্ত কমিটি আসল ও সারচার্জ (২ কোটি ১৮ লাখ ৭৭ হাজার ৬৯৬ টাকা) আদায়ের পক্ষে প্রতিবেদন জমা দেয়। এর মধ্যে আসল পরিশোধ করা হয়েছে আগেই। আর সারচার্জ আদায়যোগ্য বলে জানায় কমিটি।
দুদকের বগুড়া জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক আনোয়ারুল হক মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। পরে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।
তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক আল আমীন প্রথম আলোকে বলেন, গ্রাহকের ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বকেয়া ৭৫ মাসের বিলের মধ্যে ৪৮ মাসের সঠিক ছিল। এই কারণে তা সংশোধন করা হয়নি। গ্রাহক বিল পরিশোধ করতে দেরি করায় সারচার্জ বেশি হয়েছে। এটি অবশ্যই আদায়যোগ্য। এটি মওকুফ করা বিধিবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, সংশোধিত বিলের সঙ্গে অসংশোধিত বিলের সারচার্জ ‘প্রযোজ্য নয়’ সিদ্ধান্ত দিয়ে আসামিরা তা আত্মসাৎ করতে চেয়েছে। এটি দণ্ডবিধির ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের (৫২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।