বুয়েটে ছোট অজুহাতে ছাত্রলীগের চড়, বড়তে পিটুনি

ঠুনকো অজুহাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে চড়-থাপ্পড় খাওয়া ছিল সাধারণ বিষয়। আর অজুহাত একটু ‘বড়’ হলে খেতে হতো পিটুনি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পেটানো হতো ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে। কখনো কখনো বিভিন্ন রকম মিথ্যা অভিযোগ তুলে মারা হতো। এই হলসহ বুয়েটের বিভিন্ন হলে র‍্যাগিংয়ের নামে জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের হাতে কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের নিষ্ঠুর নির্যাতন হওয়ার ঘটনা তো আছেই।

কিন্তু বুয়েটে এসব ‘অপকর্মের’ খুব একটা বিচার হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসনও এসব বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এসব ঘটনা বাড়তে বাড়তে এখন মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার মধ্য দিয়ে বর্বরতার চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পেল।

বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) ছাত্র আবরারকে গত রোববার রাতে পিটিয়ে হত্যা করেন বুয়েট ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী।

বুয়েটের একাধিক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, সেখানে কোনো জবাবদিহি নেই। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে। আগের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়ায় নির্যাতনের শিকার হলেও অনেক সময় শিক্ষার্থীরা চেপে যেতে বাধ্য হন। প্রশাসন যদি এসব বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিত, তাহলে হয়তো মেধাবী ছাত্র আরবারকে মরতে হতো না।

আবরারকে হত্যা করা হয় তাঁর আবাসিক হল বুয়েটের শেরেবাংলা হলে। হলটি নিয়ন্ত্রণ করতেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রাসেল। আবরার হত্যায় অন্য আসামিদের সবাই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী এবং মেহেদীর অনুসারী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই হলের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) দুজন ছাত্র গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে বুয়েট ছাত্রলীগের সম্মেলনে না যাওয়ায় এবং গিয়েও চলে আসার অভিযোগ দেখিয়ে হলে থাকা ১৭তম ব্যাচের ছাত্রদের হলের ছাদে নিয়ে গিয়ে ব্যাপক পেটানো হয়। একপর্যায়ে অন্য এক ছাত্রের হাত ভেঙে দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, বাইরে গিয়ে যেন ঘটনাটি না বলেন। পরে ছাত্রটি ভয়ে অন্যদের জানান, সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙেছে।

আরেকটি ঘটনার উদাহরণ টেনে একজন ছাত্র প্রথম আলোকে বলেন, একবার হলের সামনের দেয়ালে একটি গ্রাফিতি আকাঁর ঘটনা নিয়ে এক ছাত্র ফেসবুকে পোস্ট দেন। এ নিয়ে ওই ছাত্রকে ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে পেটান ছাত্রলীগ নেতা অনিক সরকার, যিনি আবরার হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল নিজেই একজন ছাত্রকে মারধর করেন বলে জানান এই হলের দুজন ছাত্র। আরেকজন ছাত্র বলেন, হলে এমনও হয়েছে জামার হাত গুটিয়ে রাখার কারণেও ছাত্রদের চড়-থাপ্পড় দিতেন হলের ছাত্রলীগের নেতারা। এমনকি সালাম না দেওয়ার কারণেও মারধর করা হতো।

শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষ। এখানে আবরার ফাহাদকে পেটান ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। গতকাল দুপুরে।  ছবি: প্রথম আলো
শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষ। এখানে আবরার ফাহাদকে পেটান ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। গতকাল দুপুরে। ছবি: প্রথম আলো

গত বছরের ডিসেম্বরে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে তিন সাংবাদিককে সেখানকার ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা মারধর ও হয়রানি করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আটকে রাখার খবর পেয়ে তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন।

শেরেবাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ জাফর ইকবাল খান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি হলের দায়িত্বে এসেছি সাত-আট মাস হবে। এই সময়ের মধ্যে কোনো শিক্ষার্থী আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেনি যে তারা নির্যাতিত হয়েছে।’

র‍্যাগিং এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় সমস্যা। বিভিন্ন আবাসিক হলে এর শিকার হন কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা। কিছুদিন আগেও আহসানউল্লাহ হলে এক ছাত্রের কান ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার সভাপতি খন্দকার জামী উস সানী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি নিজেও একসময় র‍্যাগিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। তিনিও চান এই র‍্যাগিং বন্ধ হোক।

শেরেবাংলা হলে দেখা গেছে ‘র‍্যাগিং ইজ ক্রাইম’ নামে লেখা সতর্কতামূলক একটি ব্যানার, যদিও বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো হয়নি। বুয়েটের একটি প্রথা হলো, এক ক্লাস ওপরের শিক্ষার্থীরা তাঁদের এক ক্লাস নিচের স্তরের (ব্যাচ) শিক্ষার্থীদের ‘শাসন’ করেন। এটাকে তাঁরা বলেন, চেইন অব কমান্ড বা বুয়েটের প্রটোকল।

আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে বুয়েটের শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে থেকে যদি ছাত্রদের প্রতি যত্নশীল হওয়া যেত এবং আগের ঘটনাগুলোর শাস্তি হতো, তাহলে হয়তো এমন নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটত না। এটা আমাদের সবার ব্যর্থতা।’