ভারতে সাজা হয়ে গেছে, দেশে তদন্তই শেষ হয়নি

‘টিকটক হৃদয়’সহ সাতজনের ভারতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। একই ঘটনায় দেশে ছয় মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ।

  • ছয় মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ আসামির মধ্যে ৩ জন জামিনে আছেন। বাকিরা কারাগারে।

  • মানব পাচার আইনে করা মামলায় ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হয়।

হাতকড়াপ্রতীকী ছবি

ভারতে বাংলাদেশি তরুণীকে ধর্ষণের দায়ে রিফাতুল ইসলাম হৃদয় ওরফে ‘টিকটক হৃদয়’সহ সাত বাংলাদেশিকে ২০ মে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। অথচ একই রকম অভিযোগে এক বছর আগে রিফাতুল ইসলামসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ঢাকার হাতিরঝিল থানায় করা ছয়টি মামলার তদন্তই শেষ হয়নি।

ভারতে সাজা হওয়া রিফাতুল ও অন্য ছয় আসামি এখন দেশটির কারাগারে রয়েছেন। এদিকে বাংলাদেশে কবে নাগাদ মামলার তদন্ত শেষ হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছে না হাতিরঝিল থানা-পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও হাতিরঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মেজবাহউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, রিফাতুলসহ যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সেসব মামলার তদন্ত শেষ হতে আরও সময় লাগবে। কারণ, এসব মামলায় অনেক ভুক্তভোগী রয়েছেন। ভুক্তভোগীদের খুঁজে বের করে তাঁদের জবানবন্দি রেকর্ড করতে হবে। তিনি বলেন, এসব মামলায় ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও অনেকে পলাতক। তাঁদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ থেকে পাচারের শিকার এক তরুণী গত বছরের ২৭ মে ভারতের বেঙ্গালুরুতে নির্যাতন ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। তাঁকে নির্যাতনের একটি ভিডিও চিত্র ভাইরাল হয়। নির্যাতনে জড়িত থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রিফাতুল ওরফে টিকটক হৃদয়কে শনাক্ত করে বাংলাদেশ পুলিশ। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী তরুণীর বাবা তখন হাতিরঝিল থানায় রিফাতুলসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা করেন। এরপর ভারতে পাচারের শিকার আরও পাঁচজন তরুণী রিফাতুলের নাম উল্লেখসহ অন্যদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করেন।

ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই ছয় মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ আসামির মধ্যে ৩ জন জামিনে আছেন। বাকিরা কারাগারে।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু প্রথম আলোকে বলেন, মানব পাচারের মামলায় ভারতীয় তদন্ত সংস্থা দ্রুত তদন্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এ জন্য বিচারও হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এ ধরনের চাঞ্চল্যকর মামলায় দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া উচিত।’

আরও পড়ুনঃ টিকটক নিয়ে মামলার আসামি ১০৫, অপরাধীদের তথ্য চেয়েছে সিআইডি

তদন্ত শেষ কবে

মানব পাচার আইন অনুযায়ী, এ আইনে করা মামলায় ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হয়। তবে আন্তরাষ্ট্রীয় অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে আদালত তদন্তের সময়সীমা বাড়াতে পারেন।

মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার তৎকালীন পরিদর্শক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, ৬ মামলায় তিনি ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। আন্তরাষ্ট্রীয় এই মানব পাচার চক্রের সদস্যসংখ্যা হবে ৪০ থেকে ৫০।

হাতিরঝিল থানায় দায়ের করা ছয়টি মানব পাচার মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিম্নবিত্ত পরিবারের এসব তরুণীকে মূলত চাকরি দেওয়ার নাম করে ফাঁদে ফেলে যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। পরে ভারতের মুম্বাই, বেঙ্গালুরুসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের পতিতালয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

ভারত থেকে ফিরে আসা এক তরুণী মামলার অভিযোগপত্রে লেখেন, চাকরির ফাঁদে ফেলে রিফাতুল ওরফে টিকটক হৃদয় তাঁকেসহ তিনজন তরুণীকে ভারতে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। রিফাতুল ও তাঁর সহযোগীদের হাতে তরুণী একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন।

‘এটা দুঃখজনক’

মানবাধিকার সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারতে পাচার হওয়া প্রায় ২ হাজার নারীকে গত ১০ বছরে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ১০ হাজার নারী ভারতের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছেন। এসব নারীকে যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী প্রথম আলোকে বলেন, পাচারের শিকার তরুণীকে ভারতে নিয়ে সেখানকার পুলিশ দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে পারল। ভারতে আসামিদের সাজা হলো। অথচ একই অভিযোগে বাংলাদেশে হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত শেষ হলো না, এটা দুঃখজনক।

সালমা আলী আরও বলেন, বিলম্বিত বিচারে ভুক্তভোগীরা একপর্যায়ে আসামিদের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হন। এর ফলে আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যান।