জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে দুই দিন আগে এই অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে আদাবর থানা-পুলিশ। প্রথম আলোকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আদাবর থানার পরিদর্শক মো. ফারুক মোল্লা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মধ্যযুগীয় কায়দায় এএসপি আনিসুল করিমকে আঘাত করা হয়েছিল। মাইন্ড এইড হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অপেশাদার লোকদের দিয়ে আনিসুলের দুই হাত পিঠ মোড়া দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর আসামিরা ঘাড়ে, বুকে, মাথায় আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
২০২০ সালের ৯ নভেম্বর এএসপি আনিসুল করিমকে আদাবর থানাধীন মাইন্ড এইড হাসপাতালে ফেলে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগে খুনের মামলা হয়। তবে ঘটনার পরপর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছিল, এই রোগীর চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো পর্যায়েই চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল মামুনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
অভিযোগপত্রভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন মাইন্ড এইড হাসপাতালের পরিচালক আরিফ মাহামুদ, ফার্মাসিস্ট তানভীর হাসান, কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন, সাজ্জাদ আমিন ও ফাতেমা খাতুন, হাসপাতালের সমন্বয়ক রেদোয়ান সাব্বির, হাসপাতালের কর্মচারী মাসুদ খান, জোবায়ের হোসেন, তানিফ মোল্লা, সজীব চৌধুরী, অসীম কুমার পাল, লিটন আহম্মেদ, সাইফুল ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল মামুন।
আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তিনি সর্বশেষ বরিশাল মহানগর পুলিশে সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। তিনি এক সন্তানের জনক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি।
অভিযোগপত্রে যা বলা হয়েছে
এএসপি আনিসুল করিমের মৃত্যুরহস্য নিয়ে আদালতে জমা দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদন বলছে, এএসপি আনিসুল করিম সময়মতো বিভাগীয় পদোন্নতি না পাওয়ায় তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ঘটনার তিন থেকে চার দিন আগে চুপচাপ হয়ে যান। বিষয়টি পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন এএসপি আনিসুল করিমকে মনোচিকিৎসক দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ঘটনার আগের দিন আনিসুল করিমের একজন ভগ্নিপতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। তখন তিনি রোগীর স্বজনদের পরামর্শ দেন, সরকারি মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসাব্যবস্থা তেমন উন্নত না। রোগীকে সেবা করার মতো পর্যাপ্ত জনবল সেখানে নেই। তাই রোগীকে আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসা ভালো হবে। তিনি নিয়মিত সেখানে চেম্বার করেন। পরে ৯ নভেম্বর সকাল ৮টার সময় এএসপি আনিসুল করিমকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল মামুন আনিসুল করিমকে মাইন্ড এইড হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। নিজে হাসপাতালের পরিচালক আরিফ মাহমুদ জয়কে ফোন দেন। পরে বেলা সাড়ে ১১টার সময় আনিসুলকে মাইন্ড এইড হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।
অভিযোগপত্রের তথ্য বলছে, এএসপি আনিসুল করিম মাইন্ড এইড হাসপাতালে আসার পর সবার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করেন। তবে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের সময় হাসপাতালের পরিচালক আরিফ মাহমুদ সিগারেট খাওয়ার কথা বলে আনিসুলকে হাসপাতালের দোতলায় নিয়ে যান। আরিফ ছাড়াও রেদোয়ান, মাসুদ খান, জোবায়ের, তানভীর, তানিফ, সজীব, অসীম, লিটন ও সাইফুল চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলে দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে আনিসুলকে নিয়ে যান। কক্ষে নিয়ে যাওয়ার পরপরই আনিসুলকে মারধর করে ফেলে দেওয়া হয়। তখন আসামি মাসুদ খান ও তানভীর হাসান রোগীর পিঠের ওপর চেপে বসেন। আর অসীম আনিসুলের দুই হাত পিঠ মোড়া দিয়ে বেঁধে ফেলেন। সজীব আনিসুলের ঘাড়ে কনুই দিয়ে আঘাত করেন। তানিফ ঘাড় ও মাথায় আঘাত করেন ও আনিসুলের মাথার ওপর চেপে বসেন। লিটন, জোবায়ের ও সাইফুল রোগীর পা ও শরীর চেপে ধরে রাখেন। এর কিছুক্ষণ পর আনিসুল করিম নিস্তেজ হয়ে পড়েন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার পরিদর্শক আদালতকে প্রতিবেদন দিয়ে বলেন, এএসপি আনিসুল করিমের মৃত্যুর পর হাসপাতালের পরিচালক আরিফ মাহামুদ মুঠোফোনে চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল মামুনকে এ ঘটনা জানান। তখন আবদুল্লাহ আল মামুন দ্রুত মাইন্ড এইড হাসপাতালে আসেন। নির্মম আঘাতে আনিসুলের মৃত্যুর কথা জানার পরও এটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু প্রতিষ্ঠা করার জন্য আনিসুলকে জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান। এএসপি আনিসুল করিমের মৃত্যুর বিষয়ে চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল মামুন ১৪ বার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও আনিসুলের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, মাইন্ড এইড হাসপাতালটি অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য মালিকপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার অনুমতি নেয়নি। হাসপাতালে অত্যাবশ্যকীয় কোনো জরুরি চিকিৎসা ও সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। এএসপি আনিসুল করিমকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি না করিয়ে মাইন্ড এইড হাসপাতালে পাঠান আবদুল্লাহ আল মামুন। স্বীকারোক্তিতে আরিফ মাহামুদ জয় ও তানিফ মোল্লা এই ঘটনার সঙ্গে চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল মামুনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রকাশ করেছেন।