মানুষ কেন আত্মহত্যা করে?

লাশকাটা ঘরে পড়ে ছিল কলেজপড়ুয়া মেয়েটির মৃতদেহ। মর্গের বাইরে অপেক্ষায় আহত মন নিয়ে দাঁড়িয়ে স্কুলশিক্ষক বাবা। যিনি অনেক স্বপ্ন নিয়ে মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন ঢাকায়। ভালো লেখাপড়া করে মেয়ে তাঁর বড় চাকরি করবে। কিন্তু মেয়ে কেন অভিমান করে নিজেই নিজের জীবন দিয়ে দিলেন, তার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না? মাস ফুরানোর আগে টাকা পাঠাতেন। মেয়ের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা ছিল তাঁর। বাড়ির সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। তবু কেন এই আত্মহত্যা?

কেবল বাবা নন, লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসা পুলিশও খুঁজে পাচ্ছিল না কেন মেয়েটি আত্মহত্যা করলেন? তবে মেয়েটির পায়জামায় গোঁজা একটি চিরকুট আবিষ্কার করেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক হারুন-অর-রশিদ। মেয়েটি লিখেছেন তাঁর আত্মহত্যার কারণ।

চিকিৎসক হারুন বললেন, ‘মেয়েটি ইডেন কলেজে পড়তেন। থাকত আজিমপুরের একটি মেসে। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এক ছেলের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একসময় ছেলেটি হঠাৎ তাঁকে ছেড়ে আরেকটি মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। চিঠির ভাষ্য এ রকম, যে মেয়ের সঙ্গে তাঁর প্রেমিক নতুন করে সম্পর্ক করেছে, সেই মেয়ের যা আছে, তা সবই আছে তাঁর। নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল। হিসাব করে দেখলে অর্থ ছাড়া আর কোনো কিছুতে তাঁর কমতি নেই। মানুষের জীবনটা কী কেবলই স্বার্থের জন্য? পৃথিবী যদি স্বার্থের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে এমন জীবন তাঁর দরকার নেই।

ইডেন কলেজের এই ছাত্রীর মতো আরও অনেক আত্মহত্যা চিন্তিত করে চিকিৎসক হারুন-অর-রশিদের মনোজগৎকে। কেন এই আত্মহত্যা? তুচ্ছ কারণে আত্মহত্যা? আবেগের বশবর্তী হয়ে আত্মহত্যা? কেন? কেন? চিকিৎসক হারুনের ভাষ্যমতে, ‘মানুষ কেন আত্মহত্যা করে তার উৎস সঠিকভাবে আজও আমি খুঁজে পাইনি। প্রায় আমি আমার ছাত্রদের জিজ্ঞাসা করি, বলো তো, মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? একটি মানুষ যখন প্রতারিত হয়, যখন তার আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু ঘটে, তখন নিজের ওপর অভিমান থেকে সে আত্মহত্যা করে।’

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর সঙ্গে তাঁর এক সহপাঠী জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক করে। পরে ছেলেটি অস্বীকার করলে মেয়েটি আইনের আশ্রয় নেন। বিষয়টি তাঁর মা-বাবা ভালো চোখে দেখেননি। তাঁর পরিবার মনে করে, মেয়েটির জন্য তাদের পরিবারের সম্মান-মর্যাদা নষ্ট হয়েছে। মা-বাবা যখন মেয়েটিকে এড়িয়ে চলতে থাকেন, তখন একদিন মেয়েটি আত্মহত্যা করেন। যখন মেয়েটি আইনের আশ্রয় নিয়ে মিটফোর্ড আসেন, তখন তাঁর মা-বাবাকে চিকিৎসক হারুন দেখেছেন, তাঁরা মেয়ের ওপর বিরক্ত। আবার আত্মহত্যার পর মেয়েটির লাশ যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন সেই মা-বাবা অনেক কান্নাকাটি করেছেন।

অত্যাচারিত হতে হতে যখন কোনো মানুষ এমন একটা পর্যায় পৌঁছায়, যে অত্যাচারের প্রতিকার পাওয়ার কোনো রাস্তা থাকে না, তখন অনেকে আত্মাহুতি দিয়ে ফেলেন। এমন ঘটনা অনেক দেখেছেন চিকিৎসক হারুন। মেয়েটি থাকত দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে। দেশের বাড়ি বরিশালে। তাঁর বাবা চায়ের দোকানদার। এক গাড়িচালকের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে হয়। বছর খানেক পর তাঁর স্বামী নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কোনো কাজ করতেন না। হঠাৎ ঘরে পরপুরুষ আনার প্রস্তাব দেন। টাকার বিনিময়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়তে চাপ দেন। সত্যি সত্যি একদিন মেয়েটির ঘরে অন্য এক পুরুষকে ঢুকিয়ে দেন তাঁর স্বামী। সেদিন মেয়েটি সেই পুরুষের সামনে নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন।

হারুন বলছিলেন, সাত মাস আগে হাজারীবাগ থেকে এক নারীর লাশ আসে। মেয়েটি যখন ছোট্ট ছিল, তখন লঞ্চ দুর্ঘটনায় তাঁর মা-বাবা মারা যান। এরপর থেকে মেয়েটি তাঁর খালার কাছে বড় হতে থাকেন। তাঁর খালা অন্যের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। খালা টাকা নিয়ে মেয়েটিকে পরপুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক করতে বাধ্য করতে থাকেন। নিজের খালার এমন আচরণে একদিন মেয়েটি আত্মহত্যা করেন। চিকিৎসক হারুনের তথ্যমতে, মিটফোর্ড হাসপাতালে যেসব লাশের ময়নাতদন্ত হয়, তাঁর মধ্যে নারী-পুরুষ প্রায় সমান। এখানে যত ময়নাতদন্ত হয়, তার মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা প্রায় ৩০ ভাগ। এর ৮০ ভাগ মেয়ে, ২০ ভাগ পুরুষ। বয়স যদি ভাগ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, যেসব নারী আত্মহত্যা করছে, তাদের বয়স ১৭ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।

কেরানীগঞ্জের কলেজ পড়ুয়া এক মেয়ের সঙ্গে কলেজের একটি ছেলের সম্পর্ক হয়। মেয়ের বাবা পেশায় দরজি। ছেলের বাবা বড়লোক। ঢাকায় নিজের বাড়ি ছিল। একপর্যায়ে তাঁদের মা-বাবা মিলে বিয়ের দিন ঠিক করেন। মেয়েটির গায়েহলুদের অনুষ্ঠান হয়। হাতে মাখে মেহেদি। যেদিন মেয়েটির বিয়ে হবে, সেদিন তাঁর প্রেমিক বর মুঠোফোনে তাঁকে কল করেন। ছেলেটি মেয়ের উদ্দেশে সেদিন বলেন, তাঁদের বাড়িতে বিয়ে করতে আসতে তাঁর ভালো লাগছে না। কারণ, তাঁর বাবা সামান্য একজন দরজি। শ্বশুর কী করে, পরিচয় দিতে হবে দরজি। যার সঙ্গে দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক, সে-ই কিনা বিয়ের দিন এমন কথা বলল। এমন অভিমান থেকে মেয়েটি বিয়ের দিন গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। মেয়েটি রশিতে ঝুলছে, তখন তাঁদের বাড়িতে আসে প্রেমিকবর।

এক হাজার লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক হারুন অর রশীদ। ছবি: আসাদুজ্জামান
এক হাজার লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক হারুন অর রশীদ। ছবি: আসাদুজ্জামান

চিকিৎসক হারুন বলছিলেন, ‘আবেগময় মুহূর্তে অর্থাৎ যে বিষয়টা আরও গভীরভাবে চিন্তা করলে সমাধান হতে পারত, তা না করে অনেকে আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু থেকে বাঁচার জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নেন; যা মোটেও ঠিক নয়। যেমন অবৈধ গর্ভধারণ। হয়তো সেই নারী ভাবছেন, বিষয়টি যদি মানুষ জেনে ফেলে, তাঁকে মানুষ কী ভাববে? এ ভাবনা থেকে হয়তো আত্মহত্যা করেন। অথচ তিনি আত্মহত্যা না করলেও পারতেন। তিনি যদি ভুল করেই থাকেন, তা সংশোধনের উপায় ছিল। তিনি যদি প্রতারিত হয়ে থাকেন, এরও প্রতিকার ছিল। কিন্তু একটা সময় একটা বয়স মানুষকে হয়তো এত সুযোগ দেয় না। যে কারণে অনেক সময় মানুষ আত্মহত্যা করে; যা মোটেও কাম্য নয়। ভীষণ কষ্ট দেয়।’

বছর দেড় আগে কামরাঙ্গীরচর থেকে একটা ছেলের মৃতদেহ আসে। সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার বাবা দিনমজুর। সেদিন সন্ধ্যাবেলা তাঁর কাজ শেষে বাবা বাসায় ফেরেন। এসে বাজার করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যে ছেলে তার কাছে ২০ টাকা চাইল, ফুচকা খাবে বলে। বাবা তাকে বলে, ২০ টাকা তাকে দিলে তো বাজার হবে না। ছেলেটাকে টাকা না দিয়ে বাবা চলে যান বাজারে। বাজার করতে করতে তাঁর মনে হলো, ‘ছেলেকে তার টাকা দেওয়া উচিত ছিল। এমন কথা ভেবে বাজার কিছুটা কম করল। ২০ টাকা বাঁচালেন। সেই ২০ টাকা ফিরে এনে বাসায় এসে দেখল, ছেলে তার অভিমান করে ঘরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে।

এসব আত্মহত্যার গল্প বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক হারুন অর রশীদ কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা সমগ্র বের করে আট বছর আগের একদিন কবিতা পড়তে শুরু করেন। আবৃত্তি করেন তাঁর প্রিয় এই কবিতার চরণ।

‘জানি- তবু জানি
নারীর হৃদয়- প্রেম- শিশু- গৃহ- নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়-
আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত- ক্লান্ত করে;
লাসকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই;
তাই
লাসকাটা ঘরে
চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে ।’

আরও পড়ুন...