রূপালী ক্লাবে বসেই অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন আরফান

শাহজাহানপুরে গাড়িতে থাকা জাহিদুলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন রিকশা আরোহী কলেজছাত্রী সামিয়া আফরান জামাল। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার ও মুঠোফোনে কথোপকথনের সূত্র ধরে অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহিদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল বগুড়া থেকে মাসুম মোহাম্মদ আকাশকে গ্রেপ্তার করে। মাসুমই ওই দিন গুলি চালিয়েছিলেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
ঢাকার দক্ষিণ কমলাপুরের রূপালী সমাজ উন্নয়ন সংস্থার (রূপালী ক্লাব নামে পরিচিত) নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই এলাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরফান উল্লাহ (দামাল)
ছবি: প্রথম আলো

জাহিদুল ইসলাম ওরফে টিপু হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন আরফান উল্লাহর (দামাল) অন্যতম ‘ব্যবসা’ অস্ত্র ভাড়া দেওয়া। এ কারণে তাঁর সঙ্গে অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে একটা সখ্য রয়েছে। এটাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দক্ষিণ কমলাপুরের রূপালী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (রূপালী ক্লাব নামে পরিচিত) নিয়ন্ত্রণে নেন। এই ক্লাবে বসেই সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা দোকান ও বস্তির ভাড়া তোলেন।

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরফান উল্লাহ সম্পর্কে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত বুধবার রাতে আরফানকে গ্রেপ্তার ও একটি রিভলবার উদ্ধার করে। এই ঘটনায় মতিঝিল থানায় করা মামলায় গতকাল শুক্রবার আদালত আরফানের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পুলিশের সন্দেহ, জাহিদুল হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র আরফান সরবরাহ করেছেন।

অস্ত্রসহ আরফান উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ
ছবি: সংগৃহীত

ডিবির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার রিফাত রহমান শামীম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, জাহিদুল ইসলাম হত্যার পরিকল্পনার সময় আরফান উপস্থিত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। রিমান্ডে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হবে।

গত ২৪ মার্চ রাতে শাহজাহানপুর এলাকার ব্যস্ত সড়কে গাড়িতে থাকা জাহিদুলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন রিকশা আরোহী কলেজছাত্রী সামিয়া আফরান জামাল। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার ও মুঠোফোনে কথোপকথনের সূত্র ধরে গত রোববার রাতে ডিবি মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহিদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল বগুড়া থেকে মাসুম মোহাম্মদ আকাশকে গ্রেপ্তার করে। মাসুমই ওই দিন গুলি চালিয়েছিলেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। মাসুমকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরফানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।

রূপালী ক্লাব যার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তিনিই আশপাশে সরকারি জমিতে গড়ে তোলা অর্ধশতাধিক ঘর-গ্যারেজের ভাড়া তোলেন বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন
ছবি: প্রথম আলো

স্থানীয় বাসিন্দা ও অপরাধজগৎ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে বলেন, আরফানের বড় ভাই বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ। তাঁর পরিচয় ব্যবহার করেই নানা অপরাধে জড়িয়েছেন আরফান।

তবে আহকাম উল্লাহ গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো অবৈধ আয়ের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। নানা কারণে ২০১৪ সালের পর থেকে আমি নিজেকে মতিঝিলের রাজনীতি থেকে সরিয়ে রেখেছি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে দক্ষিণ কমলাপুর এলাকায় ঘুরে, বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রূপালী ক্লাবের পেছনে রেলের জমিতে যে ২০টি টিনের ঘর রয়েছে, কয়েক বছর ধরে সেগুলোর ভাড়া তুলছেন আরফান উল্লাহ। আকার অনুযায়ী ঘরগুলোর ভাড়া তিন থেকে চার হাজার টাকা। ক্লাবের সামনের খাসজমিতে রয়েছে প্রায় ৩৫টির মতো গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ। মাসিক ভাড়া ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এই ভাড়াও তোলেন আরফান।

মূলত ক্লাব যার নিয়ন্ত্রণে, তিনিই ভাড়া তোলেন বলে জানালেন একজন গ্যারেজমালিক। নিরাপত্তার কারণে তাঁর নাম দেওয়া হলো না। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময় বিভিন্নজন ভাড়া তুললেও দুই বছর ধরে দামাল (আরফান) ভাই সরাসরি আমাদের থেকে ভাড়া নেন।’

ক্লাবের পেছনের একটি ঘরে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন, এমন এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, মাসের ১০ তারিখের মধ্যে তাঁদের ভাড়া দিতে হয়। আরফান তাঁদের কাছ থেকে ভাড়া তোলেন।

এই বিষয়ে গতকাল কথা হয় মতিঝিল থানার ওসি ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে। তিনি বলেন, সবাই জানে কারা এসব দখল করে রেখেছে। তবে এখানকার জমি-জায়গা দখল নিয়ে থানায় কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ পেলে পুলিশ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।