শিক্ষকদের সহায়তায় গাইড বইয়ের বাণিজ্য

যে শিক্ষকেরা সঠিক পথ দেখাবেন, সেই শিক্ষকেরাই ছাত্রছাত্রীদের ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছেন। নিষিদ্ধ গাইড বই পড়তে বাধ্য করছেন। শিক্ষকেরা প্রকাশকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বইগুলো বিক্রি করতে সহায়তা করছেন।
এ অভিযোগই উঠেছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। তাঁরা টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয় ও প্রশাসনের যথাযথ তদারক না থাকায় ওই উপজেলায় গাইড বইয়ের জমজমাট ব্যবসা করছে বিভিন্ন প্রকাশনী।
দেশের আইন এবং আদালতের রায় অনুযায়ী প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত গাইড ও নোটবই নিষিদ্ধ। এ পর্যায়ের নোট ও গাইড বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশনা ও বিক্রয় দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। কিন্তু ওই আইন লঙ্ঘন করেই বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকাশনীর পক্ষে এজেন্ট ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার বিনিময়ে গাইড বইয়ের বাজার সৃষ্টি করেছে। শিক্ষকেরাও গাইড বই কিনতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তেঁতুলিয়া উপজেলায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৫টি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮ হাজার ৮৭০ জন। এর মধ্যে দু-একটি বাদে বাকি সব বিদ্যালয়েই বাংলা ও ইংরেজির আলাদা ব্যাকরণ বই পড়ানো হচ্ছে।
সম্প্রতি তেঁতুলিয়ার বুড়াবুড়ি মির্জা গোলাম হাফিজ, ভজনপুর, বেগম খালেদা জিয়া বালিকা, তেঁতুলিয়া পাইলট, কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও গিতালগছ উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে বাংলা ও ইংরেজির ব্যাকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ের গাইড বই দেখা গেছে। এসব বই পপি প্রকাশনী, অ্যাডভান্স পাবলিকেশনস, পুথি নিলয়, সিসটেমেটিক, লেকচার, পাঞ্জেরী, গ্যালাক্সি, দিকদর্শন, অবিস্মরণীয় ও ফুলকুঁড়িসহ আরও কয়েকটি প্রকাশনীর।
অন্তত ছয়টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তেঁতুলিয়া মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতিই এই গাইড বই বাণিজ্যের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তারাই পপি ও অ্যাডভান্স পাবলিকেশনের বাংলা ব্যাকরণ, পপি কমিউনিকেটিভ ইংলিশ গ্রামার, অ্যাডভান্স কমিউনিকেটিভ ইংলিশ গ্রামার অ্যান্ড কম্পোজিশনসহ বিভিন্ন গাইড বই কিনতে সবাইকে পরামর্শ দিচ্ছে। বিনিময়ে প্রকাশকদের কাছ থেকে লিখিতভাবেই নিয়েছে দুই লাখ টাকা।
এ বিষয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বুড়াবুড়ি মির্জা গোলাম হাফিজ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মুস্তান আলী বলেন, শিক্ষকদের বনভোজন করার জন্য বিভিন্ন কোম্পানি দুই লাখ টাকা দিয়েছে। ইতিমধ্যে সেই টাকায় বনভোজনও করেছে সমিতি।
শিক্ষার্থীদের গাইড ও বাইরের ব্যাকরণ বই কেনার পরামর্শ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন গিতালগছ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল বাছেদ। তবে টাকা নেওয়ার বিষয়ে তাঁর দাবি, কেউ ব্যক্তিগতভাবে নয়, সমিতির নামে টাকা নেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ করলে অ্যাডভান্স পাবলিকেশনের বিক্রয় প্রতিনিধি আরিফ বলেন, ‘শিক্ষকদের টাকা বা উপঢৌকন দেওয়ার ব্যাপারটা এজেন্ট ও কোম্পানি সরাসরি করে থাকে। মার্কেটিংয়ের জন্য উপঢৌকন দিতে হয়। এটা এখন বৈধ।’
পপি প্রকাশনীর বিক্রয় প্রতিনিধি মজাফফর আহমেদ বলেন, ‘কোম্পানি এজেন্টের মাধ্যমে সরাসরি উপঢৌকনের ব্যাপারগুলো দেখে। আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না।’
অ্যাডভান্স পাবলিকেশনের পঞ্চগড় বাজারের এজেন্ট বুক সেন্টার লাইব্রেরির মালিক ফয়জুল হক বলেন, ‘সব প্রকাশনী ও লাইব্রেরিই তাদের বই বিক্রির জন্য শিক্ষকদের উপহারসামগ্রী বা কমিশন দিয়ে থাকে।’
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জীবধন বর্মণ বলেন, এনসিটিবির বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ বই দুটি শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট। শিক্ষকদের সম্মানীর বিনিময়ে গাইড কেনার পরামর্শ দেওয়ার বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।