'উত্তেজিত' হয়ে প্রকৌশলীকে অপহরণ, পরে ক্ষমা চাইলেন আওয়ামী লীগের নেতা!

তিনি নাটোর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এক পৌর প্রকৌশলীকে অপহরণ ও তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। শেষে স্থানীয় সাংসদের ডাকা সালিসি বৈঠকে অভিযুক্ত কাউন্সিলর আরিফুর রহমান ওরফে মাসুম সব অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন।
অবশ্য প্রাথমিকভাবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন আরিফুর রহমান। তাঁর বিরুদ্ধে এক পৌর প্রকৌশলীকে শারীরিক নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যক্তিগত মতামত চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পৌরসভার চারজন প্রকৌশলী ও সচিবের যৌথ স্বাক্ষরে এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ করা হয় মেয়র, সাংসদ, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, র্যাব ৫-এর অধিনায়ক বরাবর ও সদর থানায়। স্থানীয় সাংসদ শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে এ ব্যাপারে আজ রোববার পৌরসভার মেয়রের কক্ষে সালিসি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
নাটোর পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল, শরিফুল ইসলাম, ফেরদৌস ইসলাম ও সচিব মির্জা সালাহউদ্দিনের যৌথ স্বাক্ষরে মেয়র বরাবর লিখিত অভিযোগ করা হয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২৪ মার্চ স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগপত্রটি মেয়র ছাড়াও স্থানীয় সাংসদ, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, র্যাব ৫-এর অধিনায়ক ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর পাঠানো হয়।
লিখিত দরখাস্তে অভিযোগ করা হয়েছে, পৌরসভার ১ নম্বর প্যানেল মেয়র ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুর রহমান ওরফে মাসুম বরাবরই ক্ষমতার অপব্যবহার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর ব্যক্তিগত মতামত চাপিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর মনগড়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্প তৈরি না করা ও পৌর হকার্স মার্কেটের দোকানঘরের কাগজপত্র না দেওয়ায় তিনি নিজ বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামালকে ১২ মার্চ রাতে কাঁচাবাজার এলাকা থেকে অপহরণ করেন। পরে তাঁকে একটি গুদামঘরে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। জীবন বাঁচানোর স্বার্থে ওই প্রকৌশলী কাউন্সিলরের দেওয়া তিনটি শর্ত মেনে নেওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই শর্তগুলোর মধ্যে ছিল ঘটনাটি কাউকে না বলা, কাউন্সিলরের কথামতো কাজ করা এবং কথা না মানলে অন্য কোথাও বদলি হয়ে চলে যাওয়া। ওই সময় পৌরসভার মেয়র ভারতে ছিলেন। তিনি ফিরে এলে দরখাস্তটি দাখিল করা হয়। পরে মেয়র বিষয়টি সমাধানের জন্য স্থানীয় সাংসদ শফিকুল ইসলামের কাছে যান। অভিযোগটি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রোববার দুপুরে পৌর ভবনে পৌর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাংসদ ও আওয়ামী লীগের নেতারা সালিসি বৈঠক করেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত এই বৈঠক চলে।
প্রধান অভিযোগকারী মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাউন্সিলর মাসুমের কথামতো না চলায় উনি আমার ওপর যে নির্যাতন করেছেন, তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। তিনি অশালীন ভাষায় আমাদের গালিগালাজ করেন। তাঁর নির্যাতনের প্রতিবাদে আমরা ২০ দিন অফিসে যাইনি। আমরা বিচার চেয়েছি। বিচার না পেলে অন্য কোথাও চলে যেতে বাধ্য হব। দরখাস্তে স্বাক্ষর করা অন্যরাও একই ধরনের কথা বলেছেন।’
তবে বৈঠকের আগে কাউন্সিলর আরিফুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ভবিষ্যতে মেয়র পদে নির্বাচন করতে চাই। তাই আমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আমি মোস্তফা কামালকে আদৌ মারপিট করিনি। তবে তাঁর কারণে আমার ওয়ার্ডের একটা প্রকল্পও পাস হয়নি। এ কারণে তাঁর সঙ্গে রাগারাগি করেছি। সাংসদ সালিস ডেকেছেন। দেখা যাক সেখানে কী হয়।’
পরে বৈঠক শেষে নাটোর পৌরসভার মেয়র উমা চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, বৈঠকে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়েছে। প্রকৌশলী মোস্তফা কামালের করা অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন কাউন্সিলর আরিফুর রহমান। ঘটনার সময় তিনি ‘উত্তেজিত’ ছিলেন বলে জানিয়েছেন। ভবিষ্যতে আর এ ধরনের কাজ করবেন না বলে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন আরিফুর।
সভায় উপস্থিত জেলা আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, কাউন্সিলর আরিফুর রহমান জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তাই তাঁরা দলীয়ভাবে তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছেন এবং উভয় পক্ষকে মিলেমিশে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।