অপতথ্য এখন সাংবাদিকতার স্বাধীনতার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ: তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী
বর্তমানে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার (ফ্রিডম অব জার্নালিজম) চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অপতথ্য ও বিকৃত তথ্যের বিস্তার। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৌশলের সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গণমাধ্যম সংস্কারে সরকার অংশীজনদের নিয়ে কাজ করছে।
আজ রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘রাজনীতি, ক্ষমতা ও সাংবাদিকতার আন্তঃসংশ্লেষ: তত্ত্ব, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথি বক্তব্যে এ কথা বলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। ‘বিভাগ দিবস’ উপলক্ষে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এই সেমিনারের আয়োজন করে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, একসময় তথ্যের সংকট ছিল বড় সমস্যা। এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা তথ্যের অতিপ্রবাহ। এতে অপতথ্য ও বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ অনেক বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পিতভাবে অপতথ্য ছড়িয়ে মানুষের মনোজগৎ ও নির্বাচনী আচরণ প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। আধুনিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এটি একটি নতুন বাস্তবতা হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও অপতথ্যের চ্যালেঞ্জ আরও বড় হয়ে উঠেছে। এ কারণে সরকার প্রযুক্তি, শিক্ষা ও আধুনিক পদ্ধতির সমন্বয়ে এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের উদাহরণ টেনে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ইতিহাসের প্রতিটি বড় রাজনৈতিক ঘটনার সময়ই পক্ষ ও বিপক্ষ—উভয় ধরনের সাংবাদিকতা দেখা গেছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময়ও বিগত সরকারকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে গণমাধ্যমের একটি অংশ সক্রিয় ছিল। আবার আজ বিজয়ী পক্ষের অবস্থান থেকে যে বয়ান তুলে ধরা হচ্ছে, ইতিহাস ভিন্নভাবে প্রবাহিত হলে সেই বয়ানও ভিন্ন হতে পারত। তখন অন্য রকম ভাষ্য প্রতিষ্ঠিত হতো এবং সেই ভাষ্য সমর্থনের জন্যও বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সম্পাদক ও সাংবাদিকের অভাব হতো না।
সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী বলেন, সম্পাদকদের তুলনায় সাধারণ সাংবাদিকেরা বেশি অনিরাপদ অবস্থায় কাজ করেন। গণমাধ্যমে প্রবেশের নীতিমালা ঢিলেঢালা হওয়ায় নানা ধরনের অনিয়ম তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ডের আওতায় এনে আর্থিক ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার উদ্যোগ অতীতে কার্যকরভাবে নেওয়া হয়নি।
বাক্স্বাধীনতা প্রসঙ্গে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, এর সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা সহজ নয়। কারণ, প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব আদর্শিক ও দার্শনিক অবস্থান থেকে মত প্রকাশ করেন। তবে একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড প্রয়োজন এবং সরকার সেটি এককভাবে নয়; বরং সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিয়ে নির্ধারণ করতে চায়।
ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও দায়িত্ব—এই তিন বিষয়কে সমন্বয় করে একটি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ চলছে এবং কমিশন গঠনের আগে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা প্রায় শেষ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সেমিনারের মুখ্য আলোচক দৈনিক নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর সাংবাদিকতার দায়িত্ব প্রসঙ্গে বলেন, কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, তথ্য বিশ্লেষণ করে শোষণ, বৈষম্য ও ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করাও সাংবাদিকতার দায়িত্ব। তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে নাগরিকেরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন মতামত গড়ে তুলতে পারেন।
বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ টেনে নূরুল কবীর বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক আমলের ধাঁচের বিভিন্ন আইন বহাল রয়েছে, যা সাংবাদিকতা ও মুক্তচিন্তার জন্য প্রতিবন্ধক। এ সময় তিনি ১৯৭৩ সালের প্রকাশনা-সংক্রান্ত আইনের সমালোচনা করে বলেন, প্রকাশনার অনুমতি পেতে সরকারের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকার মুচলেকা দেওয়ার বিধান গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকতা হওয়া উচিত প্রশিক্ষিত, দক্ষ এবং পেশাদার মানুষের কাজ। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের লেখনী ও কলমের মাধ্যমে সমাজে বিশাল পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে সেই সাংবাদিকতা হতে হবে বস্তুনিষ্ঠ, সত্যনিষ্ঠ এবং হলুদ সাংবাদিকতামুক্ত। সত্য সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে সাংবাদিকতার অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে।
আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা, বাধা ও সংকট থাকলেও সেগুলোই সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সাংবাদিকের প্রয়োজনই হতো না। তাই প্রতিকূলতার মধ্যেও সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে।
সেমিনারে অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। আরও উপস্থিত ছিলেন বিভাগের শিক্ষক, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।