আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এসব কথা বলেন।

দুদকের ১৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই মতবিনিময় হয়। সভায় দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) মো. মোজাম্মেল হক খান, কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হক ও দুদকের সচিব মো. মাহবুব হোসেন উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তাঁরা দুর্নীতির বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

এক সাংবাদিক বলেন, অর্থ পাচারের ফলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে—এটা রাষ্ট্র, সরকার এবং জনগণের জন্য একটি ভয়ানক বার্তা। এ বিষয়ে দুদকের কমিশনার মো. জহুরুল হক বলেন, ‘অর্থ পাচার হচ্ছে, এটা সত্যি। আমরা চেষ্টা করছি, কিন্তু অর্থ পাচারের ব্যাপারে আমাদের (দুদক) তফসিল থেকে সব নিয়ে গেছে আইন করে। এখন আমাদের যেটা আছে মাত্র একটা তফসিলভুক্ত, সেটা নিয়েই আমরা ফাইট করছি। কিন্তু সব খবর আপনাদের কাছে যায় না, অথবা সব খবর আপনারা প্রচারও করেন না। সব সময় অভিযোগ করেন, দুদক চুনোপুঁটি ধরে। কিন্তু কতগুলো রাঘববোয়াল ধরছে, তা আপনারা দেখছেন কখনো? এবং সেগুলো বিশ্ব রেকর্ড করার মতো।’

এ প্রসঙ্গে জহুরুল হক বিভিন্ন দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং অবরুদ্ধ করার তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, দুদক এ পর্যন্ত সিঙ্গাপুর থেকে ২১ কোটি টাকা মূল্যের মুদ্রা ফেরত এনেছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়া থেকে ২২ লাখ মালয়েশিয়ান রিংগিত, কানাডা থেকে ৬৫ দশমিক ৯১ কানাডিয়ান ডলার এবং ৪৩ দশমিক ৯৫ মার্কিন ডলার, অস্ট্রেলিয়ার ২৪টি ব্যাংক থেকে ৬১ দশমিক ৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার এবং কানাডিয়ান ৫ দশমিক ৫০ ডলার অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

জহুরুল হক আরও জানান, দুদক ২০২০ সালে ৮টি এবং ২০২১ সালে ১৩টি মামলা করেছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে ৪টি এবং ২০২১ সালে একটি মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, এসব মামলায় ৮০ ভাগ ফল দুদকের পক্ষে আসবে।

অর্থ পাচারসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে দুদকের চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আসার ব্যাপারে তাঁরা কোনো দেশ বা বিদেশি সংস্থার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন না। হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট অথবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাঁদের যেতে হয়। এ ছাড়া অর্থ পাচার আইনের ২৭টি অপরাধের মধ্যে শুধু একটি অপরাধ দুদকের তফসিলভুক্ত করা হয়েছে। অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে এই আইনি সীমাবদ্ধতা দুদকের জন্য বড় জটিলতা।

দুদকের চেয়ারম্যান বলেন, শুল্ক, কর, পুঁজিবাজার, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দলিল-দস্তাবেজ তৈরি, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ পাচার বেশি হয়। এই সাতটি অপরাধ যাতে দুদক তদন্ত করতে পারে, সে জন্য তাঁরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে কমিশনার মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘অর্থ পাচারের মামলায় আমাদের (দুদক) সাফল্য শতভাগ, এটা আমরা বলে আসছি। এখনো আমরা এ জায়গা থেকে সরিনি। আরও অধিক দায়িত্ব এলে সে ক্ষেত্রেও আমাদের সাফল্য কমবে না।’

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, অনেক সময় দেখা যায় দুদক এত কম টাকা আত্মসাতের দুর্নীতির মামলা করে যে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হয়ে যায়।

এর জবাবে কমিশনার জহুরুল হক বলেন, ‘আমরা একমত যে খাজনার চেয়ে কখনো কখনো বাজনা বেশি হয়ে যায়। যে মামলা হয় সেটা অর্থের ওপর নয়, অপরাধের ওপর বিচার হয়। ধরুন, একজন ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ১০ মণ গম আত্মসাৎ করে ধরা পড়েছেন, এলাকার মানুষ একত্র হয়ে সেটা জব্দ করেছেন। এই ১০ মণ গমের মামলা করতে গেলে নিশ্চয়ই ৩০ মণ গমের টাকা খরচ হবে। এই মামলাটা যখন জনগণের সামনে দিতে হয়, তখন সেই মামলার বিচার না করে উপায় থাকে না। তবে কমিশন এখন ছোট মামলা যে খুব নিচ্ছে, তা-ও না।’

অনেক ক্ষেত্রে দুদক অভিযোগ অনুসন্ধানে নিয়েই ঢালাও প্রচার করে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা না পেলে বা নির্দোষ প্রমাণিত হলে তা প্রচার করে না কেন? এ প্রশ্নের জবাবে কমিশনার মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘এই প্রচারটা আমরা যতটা না করি, খবরের গুরুত্ব বিবেচনা করে সাংবাদিকেরা বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করেন। কিন্তু যখন (অভিযোগের) পরিসমাপ্তি হয়, এই পরিসমাপ্তি যদি আমরা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলি যে অমুককে পরিসমাপ্তি দেওয়া হয়েছে। একটা ব্যক্তিকে হয়তো পরিসমাপ্তি দেওয়া হলো একটা অভিযোগের কারণে। কিন্তু সেই ব্যক্তির পরিসমাপ্তি যদি এভাবে দৃশ্যমান করা হয়, তাহলে কিন্তু আরও ১০টা অভিযোগ যে তাঁর বিরুদ্ধে চলছে বা আগামী দিনে আসবে—সে কিন্তু একটা লাইসেন্স পেয়ে যায়। এগুলো কিন্তু দেখার বিষয় আছে।’

দুদকের মামলায় সাজার হার কম। এ ক্ষেত্রে দুদকের মামলায় দুর্বলতার পাশাপাশি আইনজীবীদের দুর্বলতার অভিযোগও আছে। অধিকাংশ মামলাই এক বা দুজন আইনজীবীর হাতে।

এ বিষয়ে মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘একজন আইনজীবীর কাছে আমাদের অধিকাংশ মামলা। এটা আমরা নিজেরাও চিন্তা করেছি যে আমাদের দ্বিতীয়-তৃতীয়, চতুর্থ আইনজীবী দরকার। এটা আমাদের কমিশনে আলোচনা যে হয়নি তা নয়, আমরা ইন হাউস কথাগুলো ভাবছি। পর্যায়ক্রমে আরও সিনিয়র আইনজীবী তৈরি করার চেষ্টার মধ্যে আমরা আছি।’

২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর দুর্নীতি দমন ব্যুরো থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা হয়। আজ ছিল দুদকের ১৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। নানা আয়োজনে ঢাকায় দুদকের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উদ্যোগে দিবসটি পালন করা হয়।