অভিযোগপত্র: খতনা করাতে গিয়ে শিশু আয়ানের মৃত্যু ‘ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায়’
দুই বছর আগে হাসপাতালে খতনা করাতে গিয়ে শিশু আয়ান আহমেদের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন আদালত।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম এই অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে আদালত অভিযোগপত্রভুক্ত তিন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) কামাল হোসেন এই তথ্য জানান।
অভিযোগপত্রভুক্ত তিন আসামি হলেন—সৈয়দ সাব্বির আহম্মেদ (৩২), তাসনুভা মাহজাবীন (৩৮) ও মো. নাজিম উদ্দিন (৩৪)।
সাব্বির ঢাকার সাঁতারকুল এলাকার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া স্পেশালিস্ট। তাসনুভা একই প্রতিষ্ঠানের সার্জন। আর নাজিম এই প্রতিষ্ঠানের সহকারী অ্যানেসথেসিয়া স্পেশালিস্ট।
গত মাসে (জানুয়ারি) এই অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাড্ডা থানা–পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইয়াসিন খন্দকার।
তদন্তকারী কর্মকর্তা তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, অভিযোগপত্রভুক্ত তিন আসামির ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই শিশু আয়ানের অকালমৃত্যু ঘটেছে।
আর ছয়জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তাঁরা হলেন ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজা, ইউনাইটেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের রেজিস্ট্রার রিফাতুল আক্তার, ইউনাইটেড হাসপাতাল গুলশানের মহাব্যবস্থাপক (জিএম–প্রশাসন) বসির আহমেদ মোল্লা, সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম–প্রশাসন) মঈনুল আহমেদ, ইউনাইটেড গ্রুপের হেলথকেয়ার পরিচালক নিজাম উদ্দিন হাসান রশিদ। অভিযোগপত্রে বলা হয়, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করার মতো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-উপাত্ত–প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই ছয়জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশের বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাদী শামীম আহামেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার সন্তানের অকালমৃত্যুতে এই আসামিদেরও দায় আছে।’
মামলার এজাহারে বলা হয়, ৫ বছর ৯ মাস বয়সী আয়ানকে ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর সুন্নতে খতনা করানোর জন্য বাড্ডা থানার সাঁতারকুল এলাকার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। আয়ানের শারীরিক পরীক্ষার জন্য কিছু ‘টেস্ট’ দেন আসামি সাব্বির ও তাসনুভা। হাসপাতালে পরীক্ষার নমুনা দিয়ে ছেলেকে নিয়ে বাসায় যান। পরদিন (৩১ ডিসেম্বর) ছেলেকে নিয়ে আবার হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষার ‘রিপোর্ট’ সংগ্রহ করেন। রিপোর্ট চিকিৎসক তাসনুভাকে দেখান। রিপোর্ট ভালো আছে বলে জানান তিনি। সেদিন সকাল ৯টায় আয়ানকে অস্ত্রোপচারকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট পর হাসপাতালের বিভিন্ন চিকিৎসকেরা উদ্বিগ্নভাবে অস্ত্রোপচারকক্ষে প্রবেশ করেন। আবার বের হতে থাকেন। তখন বাদী বুঝতে পারেন, কোনো সমস্যা হয়েছে। তখন বাদীসহ তাঁর সঙ্গীরা জোর করে অস্ত্রোপচারকক্ষে প্রবেশ করেন। দেখতে পান, চিকিৎসকেরা তাঁর ছেলের বুকে হাত দিয়ে চাপাচাপি করছেন। আয়ানের বুকের দুই পাশে ফুটো করে টিউব লাগানো হয়েছে।
কোনো কাজ না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আয়ানকে দ্রুত গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যায় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, তখন বাদী উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁর ছেলেকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর কথা শোনেনি। গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে আয়ানকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। ৩১ ডিসেম্বর রাতে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিউ) ঢুকে বাদী তাঁর ছেলে আয়ানের শরীর শীতল ও নিথর দেখতে পান। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে আয়ানকে মৃত ঘোষণা করা হয়। অবহেলামূলক ভুল চিকিৎসায় তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়। পরে ৫ লাখ ৭৭ হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা শামীম আহামেদ বাড্ডা থানায় মামলা করেন।
বাড্ডা থানায়–পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, তদন্তে পাওয়া তথ্য, সাক্ষ্য–প্রমাণ ও হাইকোর্ট গঠিত বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, তিন আসামির (সাব্বির, তাসনুভা ও নাজিম) ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই আয়ানের মৃত্যু ঘটেছে।