জামদানি বাংলাদেশের—এ ইতিহাস বদলানো যাবে না
জামদানি ‘ফিরে এসেছে’—এমন দাবি করা হচ্ছে প্রতিবেশী দেশের গণমাধ্যমে। বাস্তবতা হলো, জামদানি কখনোই হারিয়ে যায়নি; বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে আছে এই জীবন্ত বয়ন–ঐতিহ্য। এটা একান্তই বাংলাদেশের। অথচ আজ এই হেরিটেজকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের দাবি, বিভ্রান্তি এবং ন্যারেটিভের লড়াই।
শেয়ারড লিগ্যাসি, না কৌশলী দাবি?
শেয়ারড লিগ্যাসি বা অভিন্ন উত্তরাধিকার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই ফল—এ উপমহাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। একসময় অখণ্ড ভারতের অংশ থাকায় বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত ও কারুশিল্পে অনেক অভিন্নতা রয়ে গেছে, যা আজও বিভিন্নভাবে আলোচিত হচ্ছে। আর এটা বেশি করে চোখে পড়ছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে একাধিক বয়ন–ঐতিহ্য নিয়ে টানাপোড়েনের কারণে। এর শুরু সেই ২০০৯ সালে উপ্পাডা জামদানি দিয়ে। এরপর আরও একটা জামদানিকে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করেছে ভারত। আবেদন করেছে আরও একটির। প্রতিবারই আমরা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি। আগেভাগে তৎপর হতে পারিনি। এখনো পারছি না।
মিডিয়া ন্যারেটিভ ও বিভ্রান্তির বিস্তার
জামদানি নিয়ে ভারতের এই ধারাবাহিক আগ্রাসনের পালে বাতাস দিচ্ছে দেশটির গণমাধ্যম ও প্রভাবকদের নিয়মিত অনৃত প্রচার। ‘জামদানি’ শব্দ ব্যবহারেই থেমে নেই এখন, বয়নকৌশলকেও তারা তাদের বলে দাবি করছে, এমনকি ইউনেসকোর স্বীকৃতি পর্যন্ত। এসবই সম্ভব হচ্ছে আমাদের বয়নকূটনীতির দুর্বলতার জন্য।
গত ২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ছাপিয়ে আলোচনায় ছিল বলিউড তারকা কঙ্গনা রনৌতের শাড়ি। নির্বাচনীয় প্রচারণায় এসে তিনি পরেছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে বোনা জমিনে কাজ করা একটা সাদা শাড়ি। এটাকে ভারতীয় পত্রপত্রিকাগুলো উল্লেখ করেছে জামদানি বলে। এমনকি তারা এটাকে ‘ইউনেসকো হেরিটেজ’ বলতেও পিছপা হয়নি।
এর পরপরই জামদানি নিয়ে একাধিক নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। এরই একটা হয়েছে ‘আজা’ (www.azafashions.com) নামের ওয়েবসাইটে। শিরোনাম: ‘দ্য জামদানি কামব্যাক: হাউ দ্য ২০০০–ইয়ার–ওল্ড বেঙ্গলি লুম ক্লেমড ইটস স্পট অন দ্য গ্লোবাল ম্যাপ’।
‘কামব্যাক’ তত্ত্বের অসারতা
আজার নিবন্ধের মূল সমস্যাই এর সূচনায়। জামদানি ফিরে আসেনি। ১৭০ বছর আগে মসলিন বিলুপ্ত হলেও জামদানি বিলুপ্ত হয়নি; বরং টিকে আছে ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বয়নশিল্পী ও তাঁদের পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা কখনো তাঁদের স্ত্রী, সমাজের অভিজাতরা, বিভিন্ন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বা বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠান এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখায় অনুঘটক হয়েছে। আর এই সংগ্রামের পুরোটাই বাংলাদেশের মানুষের। তাই এর কামব্যাক করার প্রশ্নই ওঠে না। বস্তুত ‘কামব্যাক’ ধারণাটিই বাস্তবতাবর্জিত।
এ নিবন্ধে ঢাকাকে ফেলা হয়েছে ফুলিয়া আর শান্তিপুরের কাতারে। অথচ শান্তিপুরে কোনো দিন জামদানি বোনা হয়নি। ফুলিয়াতেও না। এমনকি ফুলিয়ার বয়ন–ইতিহাস উল্লেখযোগ্যভাবে প্রাচীন নয়।
উপরন্তু এখানে খুবই অস্পষ্টভাবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এই জামদানি ‘টেকনিক’কে ইউনেসকোর ‘মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ)’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি তো আসলে তা নয়। এ প্রসঙ্গে পরে আসা যাচ্ছে।
ভুল তথ্য, ভুল ব্যাখ্যা
একই দিনে আরও একটা নিবন্ধ প্রকাশিত হয় ভোগ ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটে। সেখানে ভোগ স্টাফের বরাতে লেখা নিবন্ধের শিরোনাম: ‘নীতা আম্বানি’জ জামদানি শাড়ি ওয়াজ ওভেন টুয়েন্টিফোর মান্থস বাই আ পদ্মশ্রী অ্যাওয়ার্ডি’।
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত টাইম হানড্রেড সামিটে নীতা এই শাড়ি পরেন। ওই সম্মেলনে এই শাড়ি নিয়ে নীতাকে কথা বলতেও দেখা গেছে। এই শাড়ির নাম দেওয়া হয়েছে স্বদেশ জামদানি। এটা বুনেছেন বীরেন কুমার বসাক; তিনি ভারত সরকারের পদ্মশ্রী সম্মাননায় ভূষিত। বীরেন বসাক টাঙ্গাইল থেকে পশ্চিমবঙ্গের ফুলিয়ায় অভিবাসিত। এই শাড়ির পুরো জমিনে কাজ করা। এ ধরনের কাজ তিনি আগেও করেছেন। ভারতীয় ডিজাইনাররা তাঁদের নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কল্যাণে যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটিতে প্রদর্শনীও করেছেন। যদিও এসব কাপড় জামদানি নয়; কারণ, এসব কাপড় বোনা হয়েছে জ্যাকার্ড অথবা ভাইটাল তাঁতে। অন্যদিকে জামদানি বোনা হয় পিটলুমে।
সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাচ্ছে। এর আগে ভোগ ইন্ডিয়ার আরও একটা নিবন্ধের উল্লেখ করা যাক। ২০২৫ সালে ৮ অক্টোবর ভোগ ইন্ডিয়া নূপুর সর্বৈয়্যা ‘আলিয়া ভাট’স কাস্টম অলিভ ঢাকাই জামদানি শাড়ি ওয়াজ হ্যান্ডওভেন ওভার থ্রি মান্থস’ শিরোনামে যেটা লেখেন, সেই নিবন্ধেও হয়েছে সত্যের অপলাপ। সেখানে স্পষ্টই লেখা হয়, জামদানির উৎপত্তি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে।
ভারতে দুই বিখ্যাত ডিজাইনার জুটি আবু জানি ও সন্দীপ খোসলা এই শাড়িতে জারদোজি কাজ করান। ফলে সেটা ডিজাইনার’স শাড়ি হয়ে যায়। গেল দুর্গাপূজার সময় সেই শাড়ি পরেন আলিয়া ভাট। অথচ জামদানির মেধাস্বত্ব বয়নশিল্পীদের। ফলে তাঁদের সৃজনকে ক্ষুণ্ন করে তাঁদের বোনা শাড়িতে এভাবে ভ্যালু অ্যাড করা যায় না।
জামদানির প্রকৃত স্বরূপ
জামদানি বস্তুত ফুলতোলা মসলিন। অর্থাৎ বোনার সময় আলাদা সুতা দিয়ে হাতে নকশা তোলা হয়। এ জন্য জামদানিকে ফিগারড মসলিনও বলা হয়ে থাকে। তবে এই ফিগার মূলত ফুল, লতা, পাখির পা ইত্যাদি। সব নকশাই জ্যামিতিক। ইতিহাস বলছে, জামদানির বিকাশ মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের (১৫৬৯–১৬২৭) জমানায়। তিনি পারস্য থেকে কিছু বয়নশিল্পী নিয়ে আসেন। তাঁরাই মূলত আমাদের বয়নশিল্পীদের শেখান কাপড় বোনার সময় হাতে ফুল তোলার কৌশল। জামদানি শব্দটাও এসেছে ফারসি থেকে। এর অর্থ একাধিক। পানপাত্র কিংবা বুটা বা নকশাদার পোশাক।
১৯০০ সাল পর্যন্ত জামদানি ছিল সাদা বা কোরা রঙের। এতে রঙের ছোপ লাগে পরে। একইভাবে রেশমের সুতাও যোগ হয় একই সময়ে। এটা ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর বদৌলতে। তবে মূল জামদানি সুতি সুতায় বোনা হয়। ফলে ২ হাজার বছর পরে বাংলার তাঁত ফিরে আসার প্রসঙ্গটাই অপ্রাসঙ্গিক। কারণ, মসলিন বোনা হয়েছে ৫ হাজার বছর আগেও। আর জামদানি বোনা হচ্ছে ৫০০ বছর ধরে।
জামদানির বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যই হলো এটা স্মৃতি ও শ্রুতিনির্ভরতা। কারণ, সব নকশা বয়নশিল্পীদের স্মৃতিতে থাকে। জামদানি বোনা শেখা শুরু করতে হয় ১০ থেকে ১২ বছর বয়স থেকেই; ঠিক যেভাবে উচ্চাঙ্গসংগীত শেখে সবাই।
জামদানি বোনা হয় পিটলুম বা গর্ততাঁতে। পাশাপাশি দুজন তাঁতে বসে দুদিক থেকে কাপড় বুনে থাকেন। তাঁদের একজন ওস্তাদ আর অন্যজন হারকিত বা শাগরেদ। ওস্তাদ বুলি বলতে বলতে বলতে বোনেন। শাগরেদ সেটা অনুসরণ করে একই নকশা বুনতে থাকেন।
জামাদানির রয়েছে নিজস্ব মোটিফ, পাড় ও আঁচলের নকশা, যা বয়নশিল্পীদেরই দীর্ঘ অনুশীলনের ফলে উদ্ভাবিত। এভাবেই তৈরি হয়েছে এই বয়ন–ঐতিহ্য।
জামদানির আজকের অবস্থান এবং এর উদ্বর্তনের নেপথ্যে আছে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের অত্যন্ত কার্যকর ও সময়োপযোগী ভূমিকা। ২০১৬–১৮ সময়ে আমেরিকান অ্যাম্বাসেডরস ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশনের অর্থে পরিচালিত হয় জরিপ ও জামদানির আদি মোটিফ সংগ্রহ করে বই আকারে প্রকাশ এবং ২০১৯ সাল আয়োজিত ‘ঐতিহ্যের বিনির্মাণ’ শিরোনামে জামদানি উৎসব এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এ উৎসবের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মিউজিয়াম থেকে পাঁচ শতাধিক জামদানির ছবি সংগ্রহ করে সেখান থেকে বাছাই করা ছবি নিয়ে ৪০টির বেশি শাড়ি ও গজকাপড় তৈরি করে মাসব্যাপী প্রদর্শনী করা হয়। সেই সময়ে আমাদের বয়নশিল্পীরা টানা ও ভরনায় ২০০ কাউন্টের হাতেকাটা সুতা দিয়ে কাপড় বোনার কৌশল রপ্ত করেন। এখন তাঁরা অনায়াসে ৩০০ বা ততোধিক কাউন্টের সুতায় কাপড় বুনছেন। সেই সময়েই ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফটস কাউন্সিল সোনারগাঁকে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফটস সিটির স্বীকৃতি দেয়। জামদানির উৎকর্ষ ও জনপ্রিয়তা এভাবে বাড়তে থাকে।
ইউনেসকো স্বীকৃতি: বাস্তবতা বনাম উপস্থাপন
শুরুতে উল্লেখিত নিবন্ধে জামদানি কৌশলকে ইউনেসকোর ‘মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি তো কোনোভাবেই সঠিক নয়। বস্তুত বাংলাদেশের জামদানি বয়নকৌশলকে ‘ইন্ট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ২০১৩ সালে, আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত ইউনেসকোর অধিবেশনে। এটি বাংলাদেশের একটি স্বীকৃত ঐতিহ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমে এই স্বীকৃতিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এটা প্রথম নজরে আসে উপ্পাডাডটকম নামে একটি সাইটে। আর এখন তো দেদার লেখা হচ্ছে।
জিআই রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক পুনর্লিখন
এখানেই আসে ভৌগোলিক নির্দেশকের (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা জিআই) প্রসঙ্গ। বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় ২০০৯ সালে। সেবার ভারত তাদের উপ্পাডা জামদানিকে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের জন্য আবেদন করে এবং পেয়েও যায় পরের বছর। সেটা বন্ধের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ নানাভাবে চেষ্টা করলেও সেই সময়ে সরকার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারণে সেটা সম্ভব হয়নি।
তবে বাংলাদেশের জামদানি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের মর্যাদা পায় ২০১৬ সালে। মজার বিষয় হলো, ক্র্যাফটস কাউন্সিল অব অন্ধ্র প্রদেশের (সিসিএপি) ওয়েবসাইটে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, একসময় উপ্পাডা জামদানি বলে কিছুই ছিল না। সেখানকার বয়নশিল্পীরা প্লেন শাড়ি বুনতেন। এরপর সেখান থেকে তিনজন বয়নশিল্পী বাংলাদেশে এসে জামদানি বোনার কৌশল শিখে গিয়ে সেখানে জামদানি বোনা শুরু করেন। অথচ আমাদের তাঁতের সঙ্গে তাঁদের তাঁতের মিল নেই। তাঁরা জ্যাকার্ডে বোনেন; আমরা পিটলুমে। মিল নেই মোটিফেও। এমনকি বয়নকৌশলেও অবিকল নয়। উপ্পাডা জামদানি অনেকটা ট্যাপেস্ট্রির মতো। কোনোভাবে ওই শাড়ি জামদানি হতে পারে না। আবার বাংলাদেশ থেকে শিখে যাওয়ার বিষয়টা তাঁরা স্বীকার করলেও ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের আবেদনে সেটা উল্লেখ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে উৎপত্তি বলে ভারত যে টাঙ্গাইল শাড়ির ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের নিবন্ধন নিয়েছে, সেখানে ওই শাড়ির নকশা বা মোটিফকে আবার ‘জামদানি’ বলা হয়েছে। অথচ জামদানি কোনো নকশা নয়, জামদানি একটি বয়নকৌশল বা বয়নপদ্ধতি। ফলে নিজেরাই স্ববিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
এখানেই থেমে নেই; তারা আরও একটি জামদানির ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের আবেদন করেছে। এই আবেদনে পণ্যের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জামদানি শাড়ি অব ওয়েস্ট বেঙ্গল’। শান্তিপুর ও পূর্ব বর্ধমানের দুটি অ্যাসোসিয়েশনের নামে আবেদন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৩ এপ্রিল এই আবেদন করা করা হয়। এই আবেদনে এ শাড়ির উৎপাদন ব্যয় ২ হাজার ৫০০ রুপির কম নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যেটা বাস্তবতাবর্জিত।
এ আবেদন যে তাঁতের ছবি দেওয়া হয়েছে, সেটা ভাইটাল তাঁত। আবেদনের সঙ্গে দেওয়া বিভিন্ন ডকুমেন্টে আছে প্রচুর অসংগতি। এমনকি এখানে রবীন্দ্রনাথের ‘বাঁশি’ কবিতার পঙ্ক্তিও ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে আছে এই লাইন: ‘পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’ এই ঢাকাই মানে ঢাকায় হাতে তৈরি শাড়ি। জামদানিকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ‘ঢাকাই’ বলত। এখন সেটাকেও ওরা ‘ঢাকাই জামদানি’ বলে থাকে। যাতে তাদের সেই তথাকথিত জামদানিকে হালাল করা যায়।
এখন প্রশ্ন এসে যায়, একটা দেশে কয় ধরনের জামদানি হতে পারে? একদিকে তারা বলছে টাঙ্গাইলের মোটিফ হলো জামদানি। অন্যদিকে আবার একাধিক শাড়িকে জামদানি বলে নিজেদের দাবি করে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের নিবন্ধন নেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে তারাই আবর্তিত হচ্ছে এক বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে। পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করছে তাদের গণমাধ্যম। এটাই যদি হবে, তাহলে তাদের অন্য শাড়িকে একাধিক জায়গা থেকে জিআই পণ্যের জন্য আবেদন করে না কেন? কেনই শুধু জামদানি আর মসলিনের পেছনে লাগতে আসা?
আশু করণীয়
এটা শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্ন নয়, এটা কৌশল, নীতি ও উপস্থাপনার প্রশ্ন।
এ ক্ষেত্রে আমাদের বয়নকূটনীতিকে জোরালো করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। পাশাপাশি আমাদের হেরিটেজ ও ঐতিহ্য সম্পর্কে হবু কূটনীতিকদের অবগত করানোও প্রয়োজন। সমান্তরালে আমাদের হেরিটেজ টেক্সটাইল (কেবল জামদানি নয়) রক্ষায় সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন ও দেশে–বিদেশে আমাদের হেরিটেজ টেক্সটাইলের প্রচারণা বাড়ানো, সঠিক গবেষণার মাধ্যমে শেয়ারড লিগ্যাসির সীমা নির্ধারণ ও এর প্রচারণা, শেয়ারড লিগ্যাসির নামে আমাদের কোনো সম্পদ অন্য কেউ নিজের বলে দাবি করলে তার প্রতিবাদ করা আবশ্যক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ এবং যোগ্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততায় একটি থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি পরিকল্পনা।
নীরবতা নয়, দৃঢ় অবস্থান জরুরি
জামদানি শুধু কাপড় নয়—এটি স্মৃতি, দক্ষতা ও পরিচয়ের বয়ন।
ভুল উপস্থাপন সত্যকে মুছে ফেলতে পারে না, কিন্তু নীরবতা সেটিকে দুর্বল করে। এখনই সময় সচেতনভাবে, স্পষ্টভাবে এবং সম্মিলিতভাবে কথা বলার।
বস্তুত ইতিহাস পুনর্লিখন করা যায় না বলেই সত্যকে সামনে আনা আবশ্যক। এ সত্য আর কিছু নয়, বরং জামদানি বাংলাদেশের; মসলিন আর টাঙ্গাইলও।