২১ দিনে ডেঙ্গুতে দুই ছেলেকেই হারালেন মা–বাবা
নাজমুল পড়তেন নর্থ সাউথে, ইনতিসার পড়ত আদমজীতে। মা বললেন, ‘বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন রইল না।’
মা-বাবার দুই সন্তান। নাম মো. নাজমুল হাসান ইফতি (২৪) ও মো. ইনতিসার হাসান ইয়াস (১৬)।
নাজমুল পড়তেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে। ইনতিসার পড়ত আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে নবম শ্রেণিতে। ২১ দিনের ব্যবধানে ডেঙ্গুতে এই দুই সন্তানকে হারিয়েছেন মা-বাবা।
বাবার নাম মো. বাবুল হক। মায়ের নাম নাজমিন আক্তার। নাজমিন গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছোট মশা আমার পরিবারের সব আনন্দ নিয়ে চলে গেল। এই পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন রইল না।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩৩১ জন। বাবুল ও নাজমিনের মতো অনেক মা-বাবা তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন। অনেক সন্তান তাদের মা-বাবাকে হারিয়েছে। বহু মানুষ স্বজন হারিয়েছেন। বহু মানুষ ডেঙ্গু থেকে স্বজনকে বাঁচাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
মশার বিস্তার এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে বিস্তৃত একটি রোগে পরিণত হয়েছে। কোনো সরকারই ডেঙ্গু দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
ডেঙ্গু প্রথম ১৯৬০-এর দশকে বাংলাদেশে শনাক্ত হয়। তখন এটি ‘ঢাকা জ্বর’ নামে পরিচিত ছিল। এরপর ২০০০ সালে দেশে ডেঙ্গুর নতুন করে প্রাদুর্ভাব শুরু হয়।
মশার বিস্তার এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে বিস্তৃত একটি রোগে পরিণত হয়েছে। কোনো সরকারই ডেঙ্গু দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বর্তমান সরকার চেষ্টা করছে; তবে মৃত্যু কমছে না। এ মাসে ১৫ দিনে মারা গেছেন ৮৬ জন। অভিযোগ রয়েছে, সব আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাব ডেঙ্গুর পরিসংখ্যানে আসে না।
বাবুল ও নাজমিন দুই ছেলেকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের ভাষানটেকে নিজেদের বাড়িতে থাকতেন। বাবুল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর সেনাবাহিনীতেই বেসামরিক পদে চাকরি করছেন। নাজমিন আক্তার গৃহিণী।
বাবুল ও নাজমিনের ছোট ছেলে ইনতিসার গত ২১ সেপ্টেম্বর মারা যায়। বড় ছেলে নাজমুল মারা যান ১২ অক্টোবর। পরিবারসূত্রে জানা গেছে, প্রথমে বাবুল হক ও ছোট ছেলে ইনতিসারের একসঙ্গে ডেঙ্গু হয়। শারীরিক অবস্থার উন্নতির পর ইনতিসারকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন চিকিৎসক। তবে পরে অবস্থা খারাপ হলে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
আমি চিন্তায় ছিলাম ছেলেদের বাবাকে নিয়ে। ভেবেছিলাম তাঁর কিছু একটা হয়ে যাবে। এর মধ্যে আমাদের দুই ছেলেই চলে গেল। ছোট ছেলেটা বাবা ও ভাইয়ের মধ্যে সব থেকে লম্বা ছিল। বলত সে বাসার সিনিয়র। এমনই সিনিয়র যে সে-ই সবার আগে চলে গেল।নাজমিন আক্তার
২১ সেপ্টেম্বর ইনতিসার যখন মারা যায়, তখন বাবুল হক ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি ছিলেন। ইনতিসারকে গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে দাফন করা হয়। অক্টোবরে ডেঙ্গু ধরা পড়ে বড় ছেলে নাজমুলের। তিন দিন পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে থাকার পর ১২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়।
নাজমিন আক্তার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি চিন্তায় ছিলাম ছেলেদের বাবাকে নিয়ে। ভেবেছিলাম তাঁর কিছু একটা হয়ে যাবে। এর মধ্যে আমাদের দুই ছেলেই চলে গেল। ছোট ছেলেটা বাবা ও ভাইয়ের মধ্যে সব থেকে লম্বা ছিল। বলত সে বাসার সিনিয়র। এমনই সিনিয়র যে সে-ই সবার আগে চলে গেল।’
বাবুল হক যখন সিএমএইচে ভর্তি ছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন বড় ছেলে নাজমুল। ছোট ভাই মারা যাওয়ার পর বাবা ও মাকে আগলে রেখেছিলেন। তারপর নিজেও ডেঙ্গুতে মারা গেলেন।
ছেলেরা বড় হয়েছিল, তারপরও মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হতো নাজমিনকে। ছোট ছেলে খুব ভালো রান্না করত, ছেলের রান্না করা খাবার এখনো ফ্রিজে রয়ে গেছে।
২৬ বছরের বিবাহিত জীবন বাবুল-নাজমিনের। দুজনের বাড়ি পঞ্চগড়ে। তাঁরা বর্তমানে গ্রামের বাড়িতে আছেন। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে নাজমিন প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। পরে রাজি হন এবং মুঠোফোনে এক ঘণ্টা ছেলেদের কথা বললেন। বহু স্মৃতির কথা জানালেন। বললেন, শুধু ঘুমানোর সময় ছেলেরা তাঁর কাছছাড়া হতো। বিছানায় মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে গল্প করত। হাঁটার সময় মায়ের হাত ধরে থাকত। ছেলেরা বড় হয়েছিল, তারপরও মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হতো নাজমিনকে। ছোট ছেলে খুব ভালো রান্না করত, ছেলের রান্না করা খাবার এখনো ফ্রিজে রয়ে গেছে।
এই মা বললেন, ‘পূজার ছুটিতে ১৮ অক্টোবর পঞ্চগড় যাওয়ার কথা ছিল। বড় ছেলে নিজেই টিকিট কেটে রেখেছিল। সেই টিকিট রয়ে গেছে। অথচ তার আগেই দুই ছেলের লাশ নিয়ে পঞ্চগড়ে ছুটতে হলো। দুই ছেলের তাদের মামার সঙ্গে কলকাতায় যাওয়ার কথা ছিল। দুজনেই পাসপোর্ট করেছিল। অথচ এমন পাসপোর্ট-ভিসা পেল যে ওরা দুনিয়া থেকেই চলে গেল।’
নাজমিনের কথা ফুরায় না। বারবার তাঁর গলার স্বর ভারী হয়ে আসছিল। তিনি বলছিলেন, ‘হাসপাতালে বড় ছেলে বলত, “আমাকে ছাড়া কীভাবে থাকবা?” ইয়াসও তো নাই। আইসিইউতে ঢোকানোর আগ দিয়ে বড় ছেলে বলেছিল, “আব্বু-আম্মু, তোমরা ভালো থেকো।”’
পূজার ছুটিতে ১৮ অক্টোবর পঞ্চগড় যাওয়ার কথা ছিল। বড় ছেলে নিজেই টিকিট কেটে রেখেছিল। সেই টিকিট রয়ে গেছে। অথচ তার আগেই দুই ছেলের লাশ নিয়ে পঞ্চগড়ে ছুটতে হলো। দুই ছেলের তাদের মামার সঙ্গে কলকাতায় যাওয়ার কথা ছিল। দুজনেই পাসপোর্ট করেছিল। অথচ এমন পাসপোর্ট-ভিসা পেল যে ওরা দুনিয়া থেকেই চলে গেল।নাজমিন আক্তার
আর তো ভালো থাকা হবে না উল্লেখ করে নাজমিন বললেন, ‘আমাদের তো জীবনের সব শেষ।’
বাবা বাবুল হক টেলিফোনে কথা বলতে চাইলেন না। নাজমিন বলেন, নিজের ডেঙ্গু, তারপর দুই ছেলের মৃত্যু—সব মিলে শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব খারাপ অবস্থায় আছেন তাঁর স্বামী। স্বামীর চিকিৎসার জন্যই ঢাকায় ফিরতে হতে পারে।
ডেঙ্গুতে স্বজন হারানোর পাশাপাশি অনেকে আর্থিকভাবেও সংকটে পড়েছেন।
বাবুল ও নাজমিনের দুই ছেলের চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা। নাজমিন বলেন, ‘চিকিৎসকদের বলেছিলাম, খরচের কথা চিন্তা করবেন না। শুধু আমার ছেলেদের সুস্থ করে দিন। ছেলেদের বাড়ি নিয়ে যাব। বাড়ি তো নিতে পারলাম না।’
বাবা বাবুল হক টেলিফোনে কথা বলতে চাইলেন না। নাজমিন বলেন, নিজের ডেঙ্গু, তারপর দুই ছেলের মৃত্যু—সব মিলে শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব খারাপ অবস্থায় আছেন তাঁর স্বামী। স্বামীর চিকিৎসার জন্যই ঢাকায় ফিরতে হতে পারে।
২৪ ঘণ্টায় ১০ মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (গত বুধবার থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত) ১০ জন মারা গেছেন। এ সময় ১ হাজার ৯৪৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রোগী বেশি ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৩৩১ জন।
দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয় ২০২৩ সালে। ওই বছর দেশের ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বলে সরকারিভাবে জানানো হয়, যা আগের ২৩ বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যার চেয়ে বেশি। ২০২৩ সালে এককভাবে ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যান; যা আগের বছরগুলোর মোট মৃত্যুর (৮৪৯ জন) চেয়ে বেশি।
২০২৫ সালে মৃত্যু হয় ৩২৩ জনের। এ বছর সাড়ে ১০ মাসে মৃত্যু আগের বছরের মোট মৃত্যুকে ছাড়িয়ে গেছে (৩৩১)।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৩৩১ জন।
সরকার গত সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের বিশেষ অভিযান শুরু করে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগকে সমন্বিত করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১২ সেপ্টেম্বর কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে কাজ হচ্ছে কি না, কার্যকরভাবে হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আশা করার মতো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। হতাশার চিত্রটাই বেশি। এখন ডেঙ্গু শুধু ঢাকা শহর নয়, গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামে এডিস মশার প্রজনন কীভাবে হচ্ছে, তা জানতেই পারছি না।’
অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমানে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের যে পদ্ধতি, সেটা পদ্ধতিই ভুল। এ পদ্ধতিতে ২০০০ সাল থেকে কার্যক্রম চালিয়েও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। সারা দেশে কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ দরকার।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আশা করার মতো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। হতাশার চিত্রটাই বেশি। এখন ডেঙ্গু শুধু ঢাকা শহর নয়, গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামে এডিস মশার প্রজনন কীভাবে হচ্ছে, তা জানতেই পারছি না।সিডিসির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ
মৃত্যু শুধু সংখ্যা নয়
নাজমুল-ইনতিসারের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছিল তাঁদের মামা রোকনুজ্জামানের মাধ্যমে। দুই ভাগনের মৃত্যুর সময় তিনি কাছে ছিলেন।
রোকনুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া মানুষ সরকারের কাছে একেকটি সংখ্যা ছাড়া আর কিছু বলে মনে হয় না। তবে যে পরিবারের সদস্যরা আপনজনকে হারাচ্ছেন, শুধু তাঁরাই এ যন্ত্রণা বুঝতে পারেন।
