বেতন–ভাড়া–খাবার বিল বকেয়া, সংকটে ২০ সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত এসব কেন্দ্রে বকেয়া বেতন–বিল নিয়ে অসন্তোষ। ১ এপ্রিল থেকে খাবার সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা ঠিকাদারদের।

রাজধানীর পান্থপথে পানি ভবন কেন্দ্রে স্থাপিত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে খেলছে দুই শিশু। গত রোববার রাজধানীর পান্থপথে পানি ভবনেছবি: প্রথম আলো

জাতীয় গ্রন্থাগারে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে দুই শিশুসন্তানকে রাখেন নাজনীন আখতার। তিনি জাতীয় গ্রন্থাগারের ক্যাটালগার হিসেবে কর্মরত। স্বামী আইনজীবী। এই দম্পতির ৬ বছরের ছেলে ও ১৪ মাস বয়সী মেয়ে এই সরকারি দিবাযত্ন কেন্দ্রে থাকে। গতকাল সোমবার নাজনীন এই কেন্দ্রে সন্তানদের রাখতে এসে শোনেন, কেন্দ্র থেকে সেবাবিরতি বা কর্মবিরতি পালনের বার্তা দেওয়া হয়েছিল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। সেই বার্তা না দেখেই তিনি সন্তানদের নিয়ে চলে এসেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত থেকে কর্মকর্তা–কর্মচারীরা সরে আসায় তিনি সন্তানদের রাখতে পেরেছেন।

গতকাল গ্রন্থাগারে অবস্থিত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা হয় এই মায়ের সঙ্গে। তিনি কেন্দ্রের অস্থিরতা নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানান।

বেতন-ভাতার সমস্যার কথা শুনে আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে! দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকলে যে কী করব! ছেলেকে রাখব কোথায়? চাকরি করাই কঠিন হয়ে যাবে।
ফাতেমাতুজ যোহরা, অভিভাবক
বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগারে স্থাপিত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশুদের সঙ্গে পরিবারের ছবি এভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে
ছবি: প্রথম আলো

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ‘২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্রটি পরিচালিত হচ্ছে। অন্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে কর্ম কমিশন সচিবালয়, ভূমি ভবন, মতিঝিল, পর্যটন করপোরেশন, পানি ভবন, লালমাটিয়া, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, সড়ক ভবন ও সমবায় ভবনে। আর ঢাকার বাইরে রয়েছে আশুলিয়া, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, কক্সবাজার, নোয়াখালী ও চাঁদপুরে।

এসব কেন্দ্রে নাজনীনের মতো কর্মজীবী মায়েরা তাঁদের শিশুসন্তানদের রাখেন। কিন্তু কেন্দ্রগুলোর উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তাঁরা বিপাকে পড়ার আশঙ্কা করছেন। প্রকল্প চলমান থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি পাঁচ মাসের বকেয়া বেতন–ভাতা নিয়ে কেন্দ্রগুলোতে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিল বকেয়া থাকায় দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১ এপ্রিল থেকে কেন্দ্রগুলোতে খাবার সরবরাহ না করার ঘোষণা দিয়েছে। দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ ভাড়া বাড়িতে করা হয়েছে। ভাড়া বাসার মালিকেরা বকেয়া ভাড়ার জন্য তাগাদা দিচ্ছেন। রংপুরের দিবাযত্ন কেন্দ্রটি যে বাড়িতে পরিচালিত হচ্ছে, সেটার মালিক ক্ষুব্ধ হয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রটি তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। পরে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে সেটি খুলে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, গত বছরের জুলাই মাসে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হলেও বেতন–ভাতা পরিশোধ ও ঠিকাদারদের বিল দেওয়া নিয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ত্বরিত কোনো পদক্ষেপ না থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাড়তি মেয়াদের জন্য ১১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ছাড় হলেও অনুমোদন না হওয়ায় টাকা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন
ভূমি ভবনে স্থাপিত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে দুপুরে ঘুমিয়ে আছে শিশুরা
ছবি: প্রথম আলো

‘ঘুম হারাম হয়ে গেছে!’

গতকাল রাজধানীর তিনটি কেন্দ্রে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। কেন্দ্রগুলোর বিদ্যমান অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা উল্লেখ করে তাঁরা সংকটের দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।

তানজিলা মোস্তাফিজ নামের এক কর্মজীবী মা ৯ মাস ধরে গ্রন্থাগার কেন্দ্রে তাঁর আড়াই বছর বয়সী একমাত্র সন্তানকে রাখেন। রোববার রাতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পেয়ে তিনি গতকাল সকালে কেন্দ্রে সন্তান নিয়ে আসেননি। কর্মবিরতির সময়ে সাভারে তাঁর ফুফুর বাসায় সন্তানকে রেখে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে অফিসে যাওয়ার পর জানতে পারেন কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়েছে। পরে দুপুর ১২টার দিকে তাঁর স্বামী গিয়ে সন্তানকে কেন্দ্রে রেখে আসেন।

গতকাল ওই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ৬০টি শিশুর মধ্যে উপস্থিত আছে মাত্র ১৫টি। কারণ, অনেক অভিভাবক আগের দিন বার্তা পেয়ে কেন্দ্রে সন্তানদের নিয়ে আসেননি।

পানি ভবনের দিবাযত্ন কেন্দ্রে কথা হয় অভিভাবক ফাতেমাতুজ যোহরার সঙ্গে। তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব শাখায় চাকরি করেন তিনি। তাঁর ছয় বছর বয়সী ছেলে জুনাইদ হাবিব জিয়ান ২০২৩ সাল থেকে পানি ভবনের দিবাযত্ন কেন্দ্রে থাকে। তিনি বলেন, ‘বেতন-ভাতার সমস্যার কথা শুনে আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে! দিবাযত্নকেন্দ্র না থাকলে যে কী করব! ছেলেকে রাখব কোথায়? চাকরি করাই কঠিন হয়ে যাবে।’

প্রকল্পের তথ্য অনুসারে, ২০টি শিশু কেন্দ্রের প্রতিটিতে আসনসংখ্যা ৬০। ৪ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের সেখানে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত রাখা হয়। মা–বাবার আয়ের ওপর ভিত্তি করে মাসিক খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে। শিশুর বয়স অনুসারে, মাসিক সেবামূল্য সর্বনিম্ন এক হাজার, সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা। তবে প্রকল্পের মাধ্যমে বিশেষ ভুর্তকির ব্যবস্থাও রয়েছে। একেকটি কেন্দ্রে মোট ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে কেয়ারগিভার (শিশু পালনকারী), স্বাস্থ্য শিক্ষক, প্রাক্‌–প্রাথমিক শিক্ষক রয়েছেন।

পানি ভবনে স্থাপিত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে দোলনায় দুলছে শিশুরা
ছবি: প্রথম আলো

পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া

১১টি দিবাযত্ন কেন্দ্র নিয়ে প্রথম অবস্থায় শুরু হয় ২০১৬ সালে। তবে সেটি ২০১৮ সাল পর্যন্ত শুরু করা যায়নি। এরপর ওই সময়ে দিবাযত্ন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে ২০টি দিবাযত্ন কেন্দ্রের প্রকল্প শুরু হয়। মেয়াদ ধরা হয় ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এরপর এক বছর মেয়াদ (নো কস্ট এক্সটেনশন) বাড়ানো হয়। ২০২৩ সালে প্রথম সংশোধনী হয় এবং প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। ৮৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে জনবল ২৪৯ জন। এর মধ্যে ১৮৫ জন চতুর্থ শ্রেণির; তাঁদের আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে অবস্থিত দিবাযত্ন কেন্দ্রে গিয়ে কথা হয় দিবাযত্ন কর্মকর্তা মাহিয়া তাসনুভের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত বছরের জুলাই থেকে ৮ মাসের বেতন বকেয়া ছিল। এবার ঈদের পর ২৪ মার্চ ৩ মাসের বকেয়া দেওয়া হয়। এত দিন বেতন না পাওয়ায় তাঁকে ধার করে চলতে হয়েছে। তিন মাসের বেতন দিয়েও সেই ধার শোধ করতে পারেননি।

পান্থপথে পানি ভবনে অবস্থিত দিবাযত্ন কেন্দ্রে গিয়ে কথা হয় কেন্দ্রের শিক্ষক রুমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি রাজধানীর একটি মেসে থাকেন। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে তাঁর মা-বাবা ও ভাই-বোন থাকেন। নিজের খরচ চালিয়ে গ্রামে টাকা পাঠাতে হয় রুমার। বেতন বকেয়া থাকায় চলতে কষ্ট হয় বলে তিনি জানান।

বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে মার্চ মাসেই দুবার কর্মবিরতির ঘোষণা দেন কর্মকর্তা–কর্মচারীরা।

বিল পায় না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান

২০টি দিবাযত্ন কেন্দ্রের মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রে ঢালী এন্টারপ্রাইজ ও ৫টি কেন্দ্রে তামান্না ট্রেডিং করপোরেশন খাবার সরবরাহ করে। গত ৯ মাসের সোয়া কোটি টাকার খাবারের বিল বাকি পড়েছে তাদের। ১ এপ্রিল থেকে আর খাবার সরবরাহ করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

ঢালী এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মুরাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ৬ মাস ধরে তাঁরা বিলের জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরে ছোটাছুটি করছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না। এখন পর্যন্ত তাঁরা কোনো বিল পাননি। সর্বশেষ এ মাসে তাঁরা কর্তৃপক্ষকে আরেকটি চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, বকেয়া পরিশোধ না হলে ১ এপ্রিল থেকে তাঁরা খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেবেন। তাঁদের ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টাকার মতো বিল বকেয়া রয়েছে বলে জানান মুরাদ হোসেন।

তামান্না ট্রেডিং করপোরেশনের কর্মকর্তা মো. আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের ৩৮ থেকে ৪০ লাখ টাকার মতো বকেয়া রয়েছে। তাঁরাও আর খাবার সরবরাহ করতে পারবেন না বলে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছেন।

জানা গেছে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পর ঠিকাদারের সঙ্গে মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে এখন খাবার নেওয়া হচ্ছে। মেয়াদ বাড়ানোর পর ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) সুপারিশ করেছে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) তা অনুমোদন করেনি। ফলে ঠিকাদারেরা খাবার সরবরাহ করলেও বিল পাচ্ছে না।

বেতন-ভাতার সমস্যা সমাধানে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক অতিরিক্ত সচিব শবনম মোস্তারী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিন মাসের বকেয়া বেতন দেওয়া হয়েছে। বাকি বেতন শিগগির দিয়ে দেওয়া হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন খাবার সরবরাহ অব্যাহত রাখে, সেটা নিয়েও আমরা আলোচনা করছি। প্রকল্পটি আরও টেকসই করা ও ২০২৮ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোরও পরিকল্পনা হয়েছে।