চির-নূতনেরে দিল ডাক পঁচিশে বৈশাখ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আকাশে যে নক্ষত্রের আলো যুগের পর যুগ ধরে বাঙালির হৃদয় ও মননকে আলোকিত করে চলেছে, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ ২৫ বৈশাখ। বাঙালির চিত্ত ও সংস্কৃতিতে চিরস্থায়ী আসন পেতে থাকা কবিগুরুর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। বাঙালির কাছে তাঁর জন্মদিন কেবল এক কবির জন্মস্মরণ নয়; বরং আনন্দ, আবেগ ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক মহোৎসব।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক রুচির নির্মাতা। তাঁর সৃষ্টি মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা, মানবতা ও সৌন্দর্যের বোধ জাগিয়ে তোলে। তাঁর সাহিত্যকর্মের ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য বিপুল ও বিস্ময়কর। কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, শিশুতোষ রচনা ও চিঠিপত্র—সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যা তাঁর অনন্য সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ হয়নি। তাঁর রচিত দুই হাজারের বেশি গান আজ ‘রবীন্দ্রসংগীত’ নামে বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। তাঁর চিত্রকলা উপমহাদেশের চিত্রকলাকে আধুনিকতার পথ দেখিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে শুধু সমৃদ্ধই করেননি, তাকে আধুনিক চিন্তা, মনন ও সৌন্দর্যবোধ প্রকাশের শক্তিশালী বাহনে পরিণত করেছেন। তাঁর কবিতায় মানবহৃদয়ের সব ভাবের প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর গান আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, দেশপ্রেম ও মানবতার সুরে অনুরণিত। জীবনের এমন কোনো অনুভূতি নেই, যা তাঁর সৃষ্টিতে স্পর্শ পায়নি। বাংলা সাহিত্যকে তিনি এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে বিশ্বও বিস্ময়ে তাকিয়েছে। এ কারণে বহু যুগ পেরিয়ে গেলেও তাঁর কবিতা, গান ও দর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাংলা ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ (১৮৬১ সালের ৭ মে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঐতিহ্যবাহী ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন প্রখ্যাত দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক, মা সারদাসুন্দরী দেবী ছিলেন স্নেহময়ী গৃহিণী। পরিবারের সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলার পরিবেশে বেড়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব অল্প বয়সেই নিজের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি এবং বিশ্বসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বসভায় অনন্য মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই অর্জন ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির গৌরবের মুহূর্ত। তাঁর হাত ধরেই বিশ্বের মানুষ প্রথম গভীরভাবে বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।

সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তার, কৃষি উন্নয়ন ও সমাজ গঠনের ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথের অবদান অসামান্য। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে জ্ঞানচর্চা, মানবতা ও বিশ্বজনীনতার আদর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কৃষক ও সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্ট তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। গ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তিনি বাংলাদেশের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ তাঁরই সৃষ্টি। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংকটকালে আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর গান ও কবিতা মানুষকে সাহস, শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়ে চলছে। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ, সৌন্দর্য ও রুচিবোধের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন। বিশ্বকবির ৮০ বছরের বিপুল কর্মময় জীবনের মায়া কাটিয়েছিলেন ১৩৪৮ সনের ২২ শ্রাবণ।

কবিগুরুর জন্মদিন উপলক্ষে এবারও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ে রাজধানী ঢাকাসহ তাঁর স্মৃতিবিজড়িত শাহজাদপুর, শিলাইদহ ও পতিসরে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনা ও কবিতা আবৃত্তির মতো বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বকবিকে স্মরণ করছে।

প্রধানমন্ত্রীর বাণী

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘বাংলা সাহিত্যের মহত্তম কণ্ঠস্বর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর অমর অম্লান স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর বিদেহী আত্মার জন্য কামনা করি অনন্ত শান্তি। বিশ্বশান্তি ও মানবকল্যাণই ছিল তাঁর অবিনাশী সৃজনশীলতার মূল অন্বেষা। কাব্য, সংগীত, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, নৃত্যনাট্য, চিত্রকলার পরতে পরতে এই মানুষ, মানবতা, শান্তি, প্রেম ও প্রকৃতির জয়গান গেয়েছেন অনন্যসাধারণ শৈল্পিক কুশলতায়, যা আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চিন্তার জগতের অমূল্য সম্পদ।’

প্রধানমন্ত্রীর পোস্টে আরও লেখা হয়, ‘বর্তমান বিশ্বে চলমান যুদ্ধ-সংঘাত, বীরের রক্তস্রোত, মায়ের অশ্রুধারায় ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত পরিস্থিতি, উগ্রবাদের উত্থান, জাতিতে জাতিতে হানাহানি—এসবের কারণে রবীন্দ্রনাথ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন।’

কর্মসূচি

ঢাকায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় রবীন্দ্রজয়ন্তী উদ্‌যাপন উপলক্ষে চার দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে শিল্পকলা একাডেমি। আজ শুক্রবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন প্রধান অতিথি হিসেবে কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। আলোচনা পর্বের পরে থাকবে সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি। প্রতিদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায় অনুষ্ঠান শুরু হবে।

ছায়ানটের আয়োজনে দুই দিনের রবীন্দ্র উৎসব শুরু হবে আজ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি–ভবন মিলনায়তনে।

আবৃত্তি সংগঠন কণ্ঠশীলনের আয়োজনে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল সাড়ে আটটায় ৭৩/১ এলিফ্যান্ট রোডের রিজেন্ট প্লাজার ওয়াহিদুল হক মিলনায়তনে।

বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থার আয়োজনে দুই দিনের ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত উৎসব’ শুরু হয় আজ সকাল ১০টায় আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে। বিকেলের অধিবেশন সাড়ে পাঁচটায়। প্রতিদিন দুই বেলা অধিবেশন হবে।

বাংলা একাডেমির আয়োজনে ১১ মে বেলা তিনটায় সেমিনার ও রবীন্দ্র-পুরস্কার-২০২৬ প্রদানের অনুষ্ঠান হবে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে।