উগ্রবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার মামুনের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার মো. মামুন হোসেনকে (২৬) তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। রিমান্ড শুনানিতে মামুন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি শ্রমিক ভিসায় কাতার যাচ্ছিলেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে আগের সন্ত্রাসবিরোধী মামলাসহ দেশে ও বিদেশে উগ্রবাদী কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে ধরে।
সোমবার বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালত শুনানি শেষে মামুনের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে রোববার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মামুনকে আটক করে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সূত্র জানায়, উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের ডিটেনশন কক্ষ থেকে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁর কাছ থেকে পাসপোর্ট, মুঠোফোনসহ ব্যক্তিগত মালামাল জব্দ করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মতিউর রহমান মোল্লা সোমবার মামুনকে আদালতে হাজির করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, মামুনের ব্যবহৃত মুঠোফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, সিগন্যাল, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর যোগাযোগ, সম্ভাব্য সহযোগী, অর্থের উৎস, বিদেশ ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং নাশকতার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে আসামিপক্ষ রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করে।
শুনানিতে যা হলো
শুনানির সময় বিচারক তদন্ত কর্মকর্তার কাছে রিমান্ড আবেদনের যৌক্তিকতা জানতে চান। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী শরীফ ওয়াহিদ বখতিয়ার ও মফিজুল ইসলাম তাঁদের মক্কেলকে নির্দোষ দাবি করে মামলাটিকে হয়রানিমূলক বলে উল্লেখ করেন।
এ সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মামুন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দুটি মামলা বিচারাধীন থাকলেও তিনি জামিনে রয়েছেন এবং বিদেশ যেতে আদালত কোনো নিষেধাজ্ঞা দেননি। তিনি শ্রমিক ভিসায় কাতার যাচ্ছিলেন, কিন্তু অকারণে তাঁকে আটক করা হয়েছে। আদালতে তিনি বারবার নিজেকে নির্দোষ ও দুটি মামলাতেই জামিনে আছেন বলে উল্লেখ করেন।
এ সময় বিচারক বলেন, ‘আপনি আইনের অপব্যবহার করেছেন। বিদেশ যেতে আদালতের কোনো অনুমতি নিয়েছেন?’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ আদালতকে রিমান্ডের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, ২০২০ সালে মামুন বাংলাদেশ থেকে পর্তুগাল হয়ে ফ্রান্সে যান। সেখানে উগ্রবাদী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই বছরই তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়। সেই সময় দেশে ফেরার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২০২৪ সালে আরেকটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি আদালতে জবানবন্দিও দেন। সম্প্রতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে গ্রেপ্তার ‘ফাতাহ কমব্যাট’–এর সদস্যদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের এই বক্তব্যের পরে বিচারক তখন তদন্ত কর্মকর্তার উদ্দেশে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ যে তথ্য তুলে ধরেছে, তা রিমান্ড আবেদনে কেন উল্লেখ করা হয়নি? ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপনের নির্দেশ দেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষ আরও জানায়, মামুনের কাছ থেকে একাধিক মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। এসব ডিভাইস বিশ্লেষণ এবং তাঁর সম্ভাব্য সহযোগী, অর্থের উৎস ও বিদেশি যোগাযোগ সম্পর্কে জানতে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এ সময় অভিযুক্ত মামুন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আদালতে দাবি করেন, ২০১৯ সালে বিদেশ যাওয়ার সময় তাঁকে বিমানবন্দর থেকে আটক করে ২০ দিন গুম করে রাখা হয়েছিল। পরে গেন্ডারিয়া থানার একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে জোর করে জবানবন্দি নেওয়া হয়।
এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, মামুন একজন নির্দোষ ব্যক্তি। তিনি শ্রমিক ভিসায় কাতার যাচ্ছিলেন এবং তাঁর কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদালতের নথি সূত্রে জানা যায়, মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দক্ষিণ পাইকপাড়া এলাকার বাসিন্দা মামুন হোসেনের বিরুদ্ধে এর আগে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও গেন্ডারিয়া থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। মামলাগুলো বর্তমানে বিচারাধীন পর্যায়ে রয়েছে।