লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২
সফল উদ্যোক্তা হতে প্রয়োজন বিশ্বাস, তীব্র ইচ্ছা আর আত্মপ্রত্যয়: মোস্তফা আল মমিন
তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় চতুর্থ পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন পালকি মোটরসের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা আল মমিন। আলোচনার বিষয় ছিল ‘কোড থেকে কংক্রিটে: মোস্তফা আল মমিন ও পালকি মোটরসের যাত্রা’।
‘মানুষ, পৃথিবী ও প্রফিট—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় রেখেই আমাদের ব্যবসা করতে হবে। এতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাইন্ডসেট।’ পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন মোস্তফা আল মমিন। পডকাস্ট শোর ধারণ করা পর্বটি প্রচারিত হয় গত শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, আপনার শুরুটা কিন্তু অটোমোবাইল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে নয়; বরং সফটওয়্যার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। হঠাৎ কেন মনে হলো এই সেক্টরে কাজ করবেন?
উত্তরে মোস্তফা আল মমিন বলেন, ‘২০০৯ সালে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় ইলেকট্রিক মোটর নিয়ে একটি কোর্স করি। তখন ক্লাসে যাওয়ার সময় মোটর রিপেয়ার শপগুলো দেখে আমার খুব ভালো লাগত এবং এই জিনিসগুলো আমার পড়াশোনার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করতাম। আমি ২০১০ সালে ইউএসএ চলে যাই। সেখানে গিয়েও গাড়ি কেনাবেচা ও ফিক্সিংয়ের একটি কাজ করি, যা আমার এই আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তোলে।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, পালকি মোটরসের যাত্রা ঠিক কবে শুরু হলো?
মোস্তফা আল মমিন বলেন, ‘ইউএসএতে পড়াশোনার সময় আমি ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে কাজ করতাম। তবে এই সেক্টরে দীর্ঘ মেয়াদে ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছা ছিল না। দেশে ফিরে ২০১৬ সালে সোলার ব্যবসা শুরু করি এবং বিভিন্ন সোলার পাওয়ার প্ল্যান্টের নকশা ও পরিকল্পনায় যুক্ত থাকি। পরবর্তী সময়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম “বঙ্গ”-তেও প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করি। অবশেষে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করে পালকি মোটরস।’
মোবিলিটি কোনো ট্রান্সপোর্ট ইস্যু নিয়ে ডিফাইন করা যায় না, এটি লাইভলিহুড। এই ফিলোসফি আপনি একজন সিএনজিচালকের কাছ থেকে কীভাবে নিজের মধ্যে নিয়ে এলেন?
সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে মোস্তফা আল মমিন বলেন, ‘আমার নিজের মামা ছিলেন একজন বেবিট্যাক্সিচালক। তাঁর কষ্টটা আমি খুব কাছ থেকেই দেখেছি। ঢাকার রাস্তায় দিনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা ডিউটি করেও তাঁদের পক্ষে কখনোই নিজের সিএনজির মালিক হওয়া সম্ভব হয় না। তখনই ভাবতে শুরু করি, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কি আরও ভালো কোনো প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান আনা যায় না? ভাবনাটি থেকেই আমার এই উদ্যোগ।’
আপনার এ উদ্যোগে সিটিবয়ের অল-ওয়েদার প্রটেকশন অনেকের কাছে লাক্সারি। কিন্তু আপনার কাছে এটি নেসেসিটি কেন?
জানতে চাইলে মোস্তফা আল মমিন বলেন, ‘আমার কাছে এটি নেসেসিটিই। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামকে বিবেচনায় নিয়ে আমি সেই বাস্তবতাকে আরও মানবিক ও নিরাপদ একটি কমফোর্ট জোনের মধ্যে এনে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
এ পর্যায়ে সঞ্চালক ব্র্যান্ডের নাম ‘পালকি’ রাখার কারণ জানতে চাইলে মোস্তফা আল মমিন বলেন, ‘আমি এমন একটি নাম খুঁজছিলাম, যা আমাদের মাটির পরিচয় বহন করবে। এ জন্যই মূলত এই নামটি বেছে নিই।’
চার্জিং স্টেশন আমাদের জন্য একটি বড় স্ট্রেস পয়েন্ট। এই চ্যালেঞ্জ আপনি কীভাবে মোকাবিলা করতে চান? সঞ্চালকের প্রশ্নের উত্তরে মোস্তফা আল মমিন বলেন, ‘এটি ডেটা-ড্রিভেন হতে হবে। পালকির প্রায় ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন কিলোমিটারের ডেটা আমাদের কাছে আছে, যা থেকে আমরা জানি গাড়িগুলো কোথায় বেশি চলে। সেই পয়েন্টগুলোতে চার্জিং স্টেশন বসালে ক্রাইসিস দূর হবে। সরকারের বিদ্যুৎ প্রাইস পলিসি ইমপ্লিমেন্টেশন এবং ওয়ান–স্টপ সার্ভিস চালু করা গেলে এই চ্যালেঞ্জ দূর করা সম্ভব।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, এ ছাড়া নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কোথায় দেখছেন?
মোস্তফা আল মমিন বলেন, ‘আমাদের নীতিমালাগুলো ঠিক থাকলেও এদের বাস্তবায়নের হার খুবই কম। চার্জিং নীতিমালায় বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত থাকলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য যে ওয়ান–স্টপ সার্ভিস দরকার, সেটি এখনো নেই।’
এই চ্যালেঞ্জগুলো দূর করা সম্ভব না হলে বাংলাদেশ গ্লোবাল টেক রেসে পিছিয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে সঞ্চালক মোস্তফা আল মমিনের পরামর্শ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ খাতে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা সবচেয়ে জরুরি। সে কারণেই আমরা বাংলাদেশ ইলেকট্রিক মোবিলিটি অ্যাসোসিয়েশন (বিমা) গঠন করেছি। আমাদের প্রধান দাবি একটাই—ইন্টার-মিনিস্ট্রিয়াল কাজ সহজ করতে একটি কার্যকর ওয়ান–স্টপ সার্ভিস চালু করা।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, আপনি নিজের অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করে ব্যবসা শুরু করেছেন। এই ঝুঁকি কেন ও কীভাবে নিলেন?
মোস্তফা আল মমিন বলেন, ‘২০২২ সালে পালকি মোটরসের যাত্রা শুরু করার আগে আমি একটি নোট লিখেছিলাম—কেন এই পথ বেছে নিচ্ছি। আমার মনে হয়েছে, আমি যদি মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকতে চাই, তবে এই কাজটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। পাশাপাশি হিসাব করে দেখেছিলাম, ইউএসএতে চাকরির চেয়ে নিজের স্টার্টআপে আমার ভ্যালু তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।’
কোম্পানির ভ্যালুয়েশন নিয়ে আপনি আপস করেননি এবং এতে অনেক ইনভেস্টরকে না করতেও হয়েছে। এই আত্মবিশ্বাসের উৎস কী?
সঞ্চালকের প্রশ্নের উত্তরে মোস্তফা আল মমিন বলেন, ‘এটি আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং তাকদিরের ওপর আস্থা। একসময় আমার কাছে মাত্র ৩৭ হাজার টাকা ছিল। সেই সময় স্রষ্টার ওপর ভরসা রেখেই এগোচ্ছিলাম, তখন এক অচেনা মানুষ কোনো সুদ বা শর্ত ছাড়াই আমাকে ১০ লাখ টাকা লোন দিয়েছিলেন। পাশাপাশি গ্রাহকদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস আমাকে এই সাহস জুগিয়েছে।’
১০ বছর পর পালকিকে কোন অবস্থানে দেখতে চান—জানতে চাইলে মোস্তফা আল মমিন বলেন, ‘আমি পালকিকে একটি নিরাপদ শহরের ট্রান্সফরমার হিসেবে দেখতে চাই, যেখানে মানুষ আনন্দ ও সম্মানের সঙ্গে যাতায়াত করবে এবং চালকেরা একটি উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারবে।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে মোস্তফা আল মমিন টেক-ড্রিভেন উদ্যোক্তাদের সফলতার মূলমন্ত্র হিসেবে নেপোলিয়ন হিলের দর্শনকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘যেকোনো বড় উদ্যোগের শুরুতে নিজের ভিশনের ওপর অটুট বিশ্বাস থাকা অপরিহার্য। কারণ, এই বিশ্বাসই প্রতিকূল সময়ে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।’ এই বিশ্বাস অর্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে তিনি “অটো সাজেশন” বা বারবার নিজের লক্ষ্যকে ভিজ্যুয়ালাইজ করার ওপর গুরুত্ব দিন, যা মনের গভীরে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করে। যখন এই বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় একীভূত হয়, তখন সৃষ্টি হয় একটি “বার্নিং ডিজায়ার” বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা, যা একজন উদ্যোক্তাকে লক্ষ্য অর্জনে অবিচল রাখে।’